জুতা কেন কিনলাম

মতিউর রহমান: ২০০২ সালের জানুয়ারি টার্মে এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (AIT) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি ছিলেন আবদুল ওহাব। ফলে বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনের প্রস্তুতির বিশাল দায়িত্ব এসে পড়েছিল তাঁর কাঁধে। অনুষ্ঠান পরিচালনা থেকে শুরু করে অতিথি সামলানো—সবকিছুতেই ছিল তাঁর ব্যস্ত পদচারণা। এমনকি প্রতিদিন রিহার্সালে বিশাল কেটলি ভর্তি চা বহন করাও ছিল তাঁর অন্যতম নিয়মিত কর্তব্য।

সাংস্কৃতিক অংশের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক নুরুল আমিনের পরিবার। একদিন আবদুল ওহাবের অনুরোধে আমিও রিহার্সালে হাজির হলাম। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন মিনিস্টার।
আমি আর বর্তমানে পার্থপ্রবাসী ড. হারুন নিজেদের মধ্যে গল্প করছিলাম। হঠাৎ বজ্রপাতের মতো একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—“কথা বলা যাবে না! হল থেকে বের হয়ে যান!” কার উদ্দেশে বলা হয়েছে, তা বুঝতে আমাদের বাকি রইল না। মুহূর্তেই আমরা অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে হল থেকে বেরিয়ে এলাম। আজও ঘটনাটি মনে পড়লে হাসি পায়, যদিও তখন অপমানটা কম লাগেনি। সেই সময় AIT-এর বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা ছিল দূতাবাসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের এক ধরনের ‘রিজার্ভ বাহিনী’। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা বিরোধীদলীয় নেতারা থাইল্যান্ড সফরে এলে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমাদের উপস্থিতি প্রায় বাধ্যতামূলক ছিল। বিনিময়ে মিলত পাঁচতারকা হোটেলের বুফে ডিনারের আকর্ষণীয় সুযোগ।

কিন্তু ২০০২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে নতুন নিয়ম এলো—শিল্পীসহ মোট ৫০ জনের বেশি অংশগ্রহণ করতে পারবে না। সভাপতি আবদুল ওহাব বিষয়টি মেনে নিয়ে আমাকে বললেন, “মতিভাই, আপনি যেতে পারবেন।” নতুন সরকার, নতুন নিয়ম—সবই নতুন।

অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেওয়ার কথা সভাপতির। আগের দিন ওহাব এসে কিছুটা উদ্বিগ্ন মুখে বলল, “মতিভাই, এই পুরনো জুতা পরে মঞ্চে উঠব কীভাবে? একটা নতুন জুতা দরকার। কিন্তু পকেট একেবারে খালি।”
আমি বললাম,“চল, আজই এমবিকে সেন্টারে যাই। তোমাকে এক হাজার বাথ ধার দিলাম।” সঙ্গে যোগ দিলেন আমাদের বন্ধু বিকাশ বড়ুয়া, জেনারেল অ্যাসেম্বলি সদস্য এবং পেশায় একজন মেটালার্জিস্ট।

এরপর শুরু হলো জুতা অনুসন্ধান অভিযান। কিন্তু সমস্যা হলো, কোনো জুতাই সভাপতির পায়ে মানানসই হচ্ছে না। এক দোকান, দুই দোকান, তিন দোকান—এভাবে এমবিকে সেন্টারের প্রায় সব জুতার দোকান ঘুরেও সাফল্যের দেখা নেই। থাই ও চীনা বিক্রয়কর্মী মেয়েরা ধীরে ধীরে বিরক্ত হয়ে উঠছিল। ওহাব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “নিউ এলিফ্যান্ট রোডে জুতা কিনতেও একবার একই বিপদে পড়েছিলাম।”

তার কথা শুনে আমারও বহু বছরের পুরনো একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। তখন আমরা দুজনই কর্ণফুলী পেপার মিলসে চাকরি করি। আমার এক শ্যালিকা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুলতানা রাজিয়া হলের আবাসিক ছাত্রী। ওহাব ছুটিতে ময়মনসিংহে যাওয়ার পথে ঢাকায় যাবে শুনে আমি তাকে শ্যালিকার রুম নম্বর দিয়ে বলেছিলাম দেখা করতে। ছুটি শেষে ওহাব ফিরে এলো, কিন্তু কাউকে সঙ্গে আনতে পারল না। কয়েক মাস পর ঈদের ছুটিতে বাড়ি গেলে কথার প্রসঙ্গে আমার শ্যালিকা বলল,“আপনার ওই বন্ধুটা… ব্যাঙের পা!” আমি তো অবাক! পরে বুঝলাম, ওহাবের হাঁটার ভঙ্গি একটু আলাদা। আর আমার তীক্ষ্ণদৃষ্টি শ্যালিকা প্রথম দেখাতেই সেটা ধরে ফেলেছিল।

যাই হোক, আবার ফিরে আসি এমবিকে সেন্টারে। প্রায় সব দোকান ঘোরা শেষ। হাতে গোনা কয়েকটি দোকান বাকি। ঠিক তখনই এক দৃঢ়চেতা, স্বাস্থ্যবতী বিক্রয়কর্মী যেন মিশন নিয়ে মাঠে নামলেন। তিনি ওহাবের পায়ে একের পর এক জুতা পরাতে লাগলেন। অবশেষে বিজয়! এক জোড়া জুতা ফিট করল। দাম ৭০০ বাথ। কিন্তু ওহাব আমার কাছ থেকে ধার নিয়েছে ১,০০০ বাথ। অর্থাৎ তার হাতে উদ্বৃত্ত রইল ৩০০ বাথ। এই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণটি করলেন আমাদের বন্ধু বিকাশ বড়ুয়া। তাঁর মতে, উদ্বৃত্ত অর্থের অন্তত অর্ধেক ‘কাফফারা’ হিসেবে মধ্যাহ্নভোজে ব্যয় করা উচিত। আমরা গণতান্ত্রিকভাবে সেই প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস করলাম। লাঞ্চ শেষ করে এসি বাসে চেপে ক্যাম্পাসের পথে রওনা হলাম। দুপুরের খাবার আর বাসের আরামে আমি ও ওহাব দুজনেই ঘুমিয়ে পড়লাম।

হঠাৎ ওহাব লাফিয়ে উঠে প্রায় চিৎকার করে বলল,“সর্বনাশ!”
আমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করলাম,“কী হয়েছে?”
ওহাব মাথায় হাত দিয়ে বলল,“একুশের অনুষ্ঠানে তো আমি পায়জামা-পাঞ্জাবি পরব! আমার তো স্যান্ডেল দরকার ছিল! আমি জুতা কিনলাম কেন?”

আর আমি ভাবছি—সভাপতি হওয়া যত কঠিন, সভাপতির জুতার মাপ মেলানো তার চেয়েও কঠিন!