রিজভী শুভ: ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল হরফে লেখা থাকে ‘ঈদ’। কিন্তু দেশের সেই চেনা মাটির সুবাস, গলির মোড়ের চেনা কোলাহল আর ভোরের বাতাসে ভেসে আসা মায়ের হাতের গরম সেমাইয়ের সেই অমৃত সুগন্ধ এই দূর পরবাসের নিরেট ইট-পাথরের দেয়ালে এসে পৌঁছায় না। প্রবাসের ঈদ মানেই এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, এক নির্মম নিয়তি। যেখানে একদিকে থাকে উৎসবের এক চিলতে কৃত্রিম আলো, আর অন্যদিকে বুকজুড়ে চেপে বসে এক টুকরো জমাটবদ্ধ, নিচ্ছিদ্র একাকীত্ব।
ভোরের অ্যালার্মটা যখন কর্কশ শব্দে বেজে ওঠে, তখনো বাইরের আকাশটা কুয়াশা আর মেঘে ঢাকা ঠিক যেন মন খারাপ করা এক ধূসর ক্যানভাস। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ আনন্দের দিন, কিন্তু চারপাশের এই অচেনা, ব্যস্ত শহরটার তাতে কোনো খেয়াল নেই। ডাস্টবিন টানার চাকার আওয়াজ, দূর থেকে ভেসে আসা সাইরেন, আর মানুষের যান্ত্রিক ছুটে চলা সবকিছু অন্য আটপৌরে দিনের মতোই স্বাভাবিক। সবাই ছুটছে যার যার রুটি-রুজির ক্লান্তিকর ইঁদুরদৌড়ে। কারো তাকানোর সময় নেই, কারো জানার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই যে আজ অন্য একটি দেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে আনন্দের জোয়ার, অথচ এই শহরেরই কিছু মানুষের বুকে বইছে নীরব কান্নার নদী।
দেশে ঈদের সকালটা শুরু হতো এক অবুঝ, মধুর উন্মাদনায়। নতুন সুতি বা সিল্কের পাঞ্জাবির খশখশ শব্দ, আতরের তীব্র অথচ মিষ্টি সুবাস, আর বাবার হাত ধরে পাড়ার চেনা ঈদগাহে যাওয়ার সেই চিরন্তন দৃশ্য। যেখানে প্রতিটি চেনা মুখের সাথে চোখাচোখি হওয়া মানেই ছিল এক বুক ভরা ভালবাসা, এক পরম আলিঙ্গন। কিন্তু প্রবাসের এই বন্ধ ঘরে? এখানে ঈদের সকালটাও শুরু হয় এক তীব্র অপরাধবোধ আর ঘড়ির কাঁটার তাড়ায়। হয়তো একটু পরেই একটা জরুরি শিফট আছে, সুপারশপের কাউন্টারে গিয়ে যান্ত্রিক হাসিমুখে দাঁড়াতে হবে, কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অ্যাসাইনমেন্টের ডেডলাইন গলার ফাঁস হয়ে তাড়া করছে।
যদি ছুটির দিনও হয়, তবুও বিছানা থেকে ওঠার পর ঘরের সেই ভৌতিক নিস্তব্ধতা যেন পুরো শরীরজুড়ে এক নিদারুণ অবশতা এনে দেয়। আলমারি থেকে নতুন পাঞ্জাবিটা বের করে যখন গায়ে জড়ানো হয়, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড্ড অচেনা, বড্ড একাকী আর নিঃস্ব লাগে। আয়নার কাচ পেরিয়ে মনটা মুহূর্তেই ছুটে চলে যায় হাজার মাইল দূরে ফেলে আসা সেই চেনা উঠোনে, যেখানে হয়তো এই মুহূর্তে মা জায়নামাজ গুটিয়ে আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছেন।
কিন্তু সেই আলিঙ্গনের মাঝে কোথায় যেন একটা ‘অদৃশ্য বরফের দেয়াল’ রয়েই যায়। কেউ কারো চোখের দিকে তাকায় না, কারণ সবাই জানে তাকালেই নিজের ভেতরের শূন্যতাটা ধরা পড়ে যাবে।
এখানেও ঈদের নামাজ হয়। কোনো কনভেনশন সেন্টার বা চার্চের হলরুমে প্রবাসী বাঙালিরা এক হন, চেনা ভাষায় ‘ঈদ মোবারক’ বলে কোলাকুলিও হয়। কিন্তু সেই আলিঙ্গনের মাঝে কোথায় যেন একটা ‘অদৃশ্য বরফের দেয়াল’ রয়েই যায়। কেউ কারো চোখের দিকে তাকায় না, কারণ সবাই জানে তাকালেই নিজের ভেতরের শূন্যতাটা ধরা পড়ে যাবে। নামাজ শেষ হতেই যে যার মতো ঘড়ি দেখেন, মুঠোফোন চেক করেন এবং দ্রুত ছুটে চলে যান কর্মস্থলে কিংবা যান্ত্রিক রুটিনে। উৎসবের খোলনলচে, অর্থাৎ নতুন পোশাক আর কৃত্রিম কোলাকুলি ঠিকই থাকে, শুধু ভেতরের সেই চেনা ‘প্রাণটা’ কোথায় যেন হারিয়ে যায়।
প্রবাসীরা যে ঈদ উদযাপনের চেষ্টা করেন না, তা নয়। প্রবাসী ভাই-বোনেরা মিলে একসঙ্গে নামাজ পড়া, একে অপরের ফ্ল্যাটে যাওয়া, কিংবা একটু ভালো-মন্দ রান্না করার আপ্রাণ, ক্লান্তিকর চেষ্টা চলে। টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা কাচ্চি বিরিয়ানি, রোস্ট, জর্দা কিংবা চেনা কোনো মিষ্টান্ন সাজানো থাকে। কিন্তু প্লেটে প্রথম লোকমাটা তোলার পর গলাটা কেমন যেন আটকে আসে। সবকিছু আছে, শুধু সেই তৃপ্তিটুকু নেই। মায়ের হাতের রান্নায় যে একটা অদৃশ্য আশীর্বাদ আর পরম মমতা মিশে থাকত, তার বিকল্প এই আধুনিক কিচেনের দামী দামী মসলা কোনোদিনও দিতে পারে না।
সবচেয়ে বুকভাঙা সময়টা আসে তখন, যখন ডাইনিং টেবিলে বসে সবাই জোর করে হাসিমুখে গল্প করে, অথচ প্রত্যেকের চোখের কোণায় এক নিদারুণ শূন্যতা আর ক্লান্তি খেলা করে। উৎসবের সব আলো, সব রাজকীয় আয়োজন যেন এক মুহূর্তে ফিকে হয়ে যায়, যখন মনে পড়ে এই আনন্দের ক্ষণে সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলো, যাদের মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে এই দূর পরবাসে পড়ে থাকা, তারাই আজ পাশে নেই।
মা হয়তো স্ক্রিনের ওপার থেকে ঝাপসা চোখে, কাঁপানো গলায় জিজ্ঞেস করেন: “বাবা, ঈদে কী রান্না করলি? নতুন জামাটা পরেছিস? মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন রে তোর? ঠিকমতো খেয়েছিস তো?” বুকের ভেতর কান্নার দলাটা পাথর চাপা দিয়ে, গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে, ঠোঁটে এক চিলতে যান্ত্রিক হাসি ফুটিয়ে মিথ্যা উত্তর দিতে হয়: “হ্যাঁ মা! অনেক কিছু রেঁধেছি, বন্ধুরা এসেছিল, সবাই মিলে খুব আনন্দ করছি। তুমি একদম চিন্তা কোরো না মা, আমি খুব ভালো আছি।”
দুপুরের দিকে যখন ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা মুঠোফোনটা চেনা সুরে রিং হয়ে ওঠে, স্ক্রিনে ভেসে ওঠে মায়ের মুখ, বাবার মলিন কিন্তু গর্বিত হাসি কিংবা ভাইবোনের খুনসুটি তখন বুকের ভেতরটা মুচড়ে, ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে চায়। মা হয়তো স্ক্রিনের ওপার থেকে ঝাপসা চোখে, কাঁপানো গলায় জিজ্ঞেস করেন: “বাবা, ঈদে কী রান্না করলি? নতুন জামাটা পরেছিস? মুখটা এমন শুকিয়ে আছে কেন রে তোর? ঠিকমতো খেয়েছিস তো?” বুকের ভেতর কান্নার দলাটা পাথর চাপা দিয়ে, গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে, ঠোঁটে এক চিলতে যান্ত্রিক হাসি ফুটিয়ে মিথ্যা উত্তর দিতে হয়: “হ্যাঁ মা! অনেক কিছু রেঁধেছি, বন্ধুরা এসেছিল, সবাই মিলে খুব আনন্দ করছি। তুমি একদম চিন্তা কোরো না মা, আমি খুব ভালো আছি।”
প্রবাসের ঈদ আনন্দ আসলে চশমার কাচে জমে থাকা এক ফোঁটা অশ্রুর মতোই যা বাইরে থেকে কেউ দেখতে পায় না, কিন্তু ভেতরের পুরো দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দেয়।
কিন্তু সেই যান্ত্রিক হাসির আড়ালে যে কত বড় একাকীত্বের পাহাড় লুকিয়ে থাকে, তা কেবল ওই প্রবাসী নিজেই জানেন। ভিডিও কলটা কেটে যাওয়ার পর ঘরের চার দেওয়ালে যে নিস্তব্ধতা নেমে আসে, তা যেন জীবন্ত কোনো দানবের মতো গ্রাস করতে চায় পুরো অস্তিত্বকে। প্রবাসের ঈদ আনন্দ আসলে চশমার কাচে জমে থাকা এক ফোঁটা অশ্রুর মতোই যা বাইরে থেকে কেউ দেখতে পায় না, কিন্তু ভেতরের পুরো দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দেয়। আসলে প্রবাসের বুকে এই পবিত্র মিথ্যাটুকু কমবেশি প্রতিটি প্রবাসীকেই বুক ফেটে বলতে হয়। স্ক্রিনের ওপাশের চেনা আনন্দধ্বনি এপাশের একাকীত্বকে যেন আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দেয়। ফোনটা কাটার পর ঘরের নীরবতাটা তীরের মতো এসে গায়ে বিঁধতে থাকে। তখন মনে হয়, এই বিশাল, চোখ ধাঁধানো শহরে নিজের বলতে সত্যিই কেউ নেই। প্রবাসের ঈদ আসলে এক অদ্ভুত, অবর্ণনীয় অনুভূতির নাম। একদিকে বুকভরা সোনালী স্মৃতি আর একাকীত্বের নীল কষ্ট, অন্যদিকে অচেনা এই তপ্ত রৌদ্রের কিংবা বরফঢাকা শহরেই এক টুকরো ‘স্বদেশ’ খুঁজে নেওয়ার এক নিরন্তর, ক্লান্তিকর যুদ্ধ। তবুও, প্রবাসীরা বেঁচে থাকেন আগামী দিনের বুকভরা আশা নিয়ে পরের ঈদে হয়তো সব ছুটি জমিয়ে, সব ব্যস্ততা পায়ে ঠেলে আবার ফেরা হবে সেই চেনা কোলাহলে, চেনা মানুষের পরম ভিড়ে, মায়ের সেই চেনা আঁচলের ছায়ায়।
এই তীব্র একাকীত্ব, এই ফেলে আসা স্মৃতির হাহাকার আর চোখ মোছার আড়ালেই প্রবাসীরা প্রতি বছর ঈদ কাটান। দিনশেষে যখন রাতের অন্ধকার নামে, আর যান্ত্রিক শহরের হাজারো রঙিন নিয়ন আলো জ্বলে ওঠে, তখন জানালার গ্রিল ধরে আকাশের সেই চিরচেনা চাঁদের দিকে তাকিয়ে প্রবাসীরা এক অদ্ভুত সান্ত্বনা খোঁজেন। কারণ, তারা জানেন এই চাঁদটাই এখন তাদের প্রিয় বাংলাদেশে, তাদের মায়ের ঘরের টিনের চালের ওপর, কিংবা চেনা বারান্দায় আলো ছড়াচ্ছে। প্রবাসের ঈদ হয়তো শতভাগ আনন্দের হয় না, কিন্তু তা প্রতি মুহূর্তে শিখিয়ে দেয় প্রিয়জনদের মূল্য কতটা গভীর, কতটা অসীম। এই এক টুকরো একাকীত্ব আর চোখের জলই আসলে এক অদৃশ্য, অবিচ্ছেদ্য সুতো যা দূর পরবাসে হাজার মাইল দূরে রেখেও প্রবাসীদের প্রতি সেকেন্ডে বেঁধে রাখে দেশের মাটির সাথে, প্রিয় মানুষের প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে।