মেঘেদের ডানায় রবীন্দ্রসুর: অ্যাডিলেডে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় অনন্য এক ‘প্রাণের মেলা’

রিজভী শুভ: মেঘগুলো যেন নেমে এসেছিলো মাটির খুব কাছাকাছি, ঠিক জানালার ওপাশটায়। মেঘের সেই ধূসর ডানায় ভর করে চারপাশের চেনা শহরটাও কেমন যেন অচেনা, রূপকথার মতো রহস্যময় রূপ ধারণ করেছিল। এমন বাদল দিনে অ্যাডিলেডের চেনা রাস্তাঘাটগুলো যেন অলস পায়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। গাছপালার পাতা বেয়ে টুপটুপ করে ঝরে পড়া বৃষ্টির জল আর সোঁদা মাটির গন্ধ মিলেমিশে এক অদ্ভুত উদাসীনতা ছড়িয়ে দিয়েছিল চারদিকে। কখনো যখন ঝুমঝুম করে মুষলধারে বৃষ্টি নামছিল, তখন জানালার কাঁচে জলবিন্দুর নকশা দেখতে দেখতে মনটা কেমন যেন আনমনা হয়ে উঠছিল। আবার যখন বৃষ্টি কমে এসে কেবল টিপটিপ করে ঝরছিল, তখন মনে হচ্ছিল প্রকৃতির বুকে এক গভীর শান্ত সুর বাজছে।

এমন মেঘলা, বৃষ্টিভেজা দিনে মনটা কোনো কারণ ছাড়াই ঘরের কোণ কোণ খোঁজে, এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা বা কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে প্রিয় কোনো বইয়ের পাতায় ডুব দিতে ইচ্ছে করে। কিংবা হয়তো জানালার পাশে বসে কেবলই বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুনে আর মেঘেদের আনাগোনা দেখে অলস সময় পার করে দিতে মন চায়। ঠিক এমন একটা দিনই তো কবিগুরুর সেই অমোঘ বাণী মনে করিয়ে দেয়—‘এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়…’। আর প্রকৃতির এই রোদনভরা রূপকে সাক্ষী রেখেই, প্রবাসের বুকে রবি ঠাকুরের প্রকৃতি ও প্রেমের গানে মেতেছিলেন অ্যাডিলেডের বাঙালিরা। প্রকৃতি নিজেই যেন সেই গানের সুর ধরে অবতীর্ণ হয়েছিল এক নতুন রূপে। প্রবাসী বাঙালির হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কতটা জুড়ে আছেন, তারই এক চমৎকার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার ব্রডভিউয়ের রবিবাসরীয় সন্ধ্যা। ২৪ মে (রবিবার) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় ৮৪ গলওয়ে অ্যাভিনিউয়ের এক অনাড়ম্বর আয়োজনে বসেছিল রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার আসর—”প্রাণের মেলা”।

কোনো ধরনের কৃত্রিম জাঁকজমক, মঞ্চের জৌলুস কিংবা প্রবেশ মূল্য ছাড়াই আয়োজিত এই আসরের মূল উদ্দেশ্যই ছিল প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল দূরে ঠেলে রবি ঠাকুরের প্রকৃতি ও প্রেমের গানগুলোকে সকলে মিলে একসঙ্গে গাওয়া, শোনা এবং হৃদয়ে ধারণ করা। বাইরের বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের সাথে মিলনায়তনের ভেতরের রবীন্দ্রসুর মিলেমিশে এক অদ্ভুত একাত্মতা তৈরি করেছিল। আয়োজকদের উদ্দেশ্যই ছিল রবি ঠাকুরের প্রকৃতি ও প্রেমের গানগুলোকে সকলে মিলে একসঙ্গে গাওয়া এবং প্রাণভরে উপভোগ করা। অনুষ্ঠানের মূল আহ্বানই ছিল— চোখ বন্ধ করে, মন খুলে রবি ঠাকুরের সৃষ্টিতে ডুব দেওয়া। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সপ্তাহের ব্যস্ততা ভুলে স্থানীয় বাঙালিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই আসরে শামিল হন। হলভর্তি দর্শক-শ্রোতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি রূপ নেয় এক টুকরো শান্তিনিকেতনে।

আসর শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতির গান দিয়ে। এরপর একে একে পরিবেশিত হয় প্রেম ও পূজা পর্যায়ের বেশ কিছু কালজয়ী গান। অনুষ্ঠানে কোনো একক শিল্পীর বৃত্ত ছিল না; বরং উপস্থিত সকলেই কখনো একক কণ্ঠে, কখনো বা সমবেত সুরে গলা মিলিয়েছেন। শুধু প্রবীণ বা মধ্যবয়সীরাই নন, অ্যাডিলেডে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো, যা প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির সুদূরপ্রসারী যাত্রাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রবাসের মাটিতে দাঁড়িয়ে অনুজদের মুখে রবীন্দ্রসুর যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল—বাংলা সংস্কৃতি ও শিকড়ের যাত্রা কতটা সুদূরপ্রসারী।

স্থানীয় শিল্পীদের সুনিপুণ পরিবেশনায় অনুষ্ঠানস্থল জুড়ে তৈরি হয় এক মায়াবী পরিবেশ। অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছিল রবীন্দ্রসংগীতের বেশ কিছু জনপ্রিয় এবং ভাবগম্ভীর গান নিয়ে। ঋতু পরিবর্তনের গান এবং প্রকৃতির রূপের বর্ণনায় শিল্পীরা পরিবেশন করেন দারুণ কিছু গান, যা উপস্থিত দর্শকদের মনে বাংলার ষড়ঋতুর স্মৃতি সতেজ করে তোলে। বিরহ, মিলন আর নিভৃত অনুভূতির গানগুলো প্রবাসের মাটিতে এক অন্যরকম আবেগের আবহ তৈরি করে। দর্শকদের গুনগুনানি এবং করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন। আসরে রবি ঠাকুরের প্রকৃতি, প্রেম ও পূজা পর্যায়ের বেশ কিছু কালজয়ী গান পরিবেশন করা হয়। অনুষ্ঠানে কোনো একক শিল্পীর বৃত্ত ছিল না; বরং উপস্থিত সকলেই কখনো একক কণ্ঠে, কখনো বা সমবেত সুরে গলা মিলিয়েছেন। এই সুরের যজ্ঞে ও আনন্দ আড্ডায় মেতে উঠেছিলেন রিমা সাহা, শান্তা, রত্না, মিতা পালিত, শ্যামল চৌধুরী, পারমিতা, ঝংকার ও তুশিন। অনুষ্ঠানে আরও কণ্ঠ মেলান ফারিয়া, শৌতি, রকিব, তিথি, প্রতিমা, হৈমন্তী, মৌমিতা ও নন্দিতা। সেই সঙ্গে সুখেন কর্মকার, লিপন, সুদীপ্ত, তন্ময়, ডেইজি হামিদ, তমা, জয়ন্ত, নাজিয়া এবং আমন বিদৌরাসহ প্রবাসের বহু পরিচিত মুখ এই নান্দনিক সন্ধ্যায় প্রাণ ঢেলে দেন। শুধু প্রবীণ বা মধ্যবয়সীরাই নন, অ্যাডিলেডে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো।

 

নির্ধারিত সময় ঠিক সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত একটানা চলে এই সুরের মায়াজাল। গান ও আড্ডার চমৎকার সমন্বয়ে পুরো মিলনায়তন জুড়ে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
সফল এই আয়োজন শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জাফরীন জলিল উপস্থিত সবার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন “সারাদিনের এত বৃষ্টি আর ব্যস্ততা সত্ত্বেও যারা আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন, মন দিয়ে গান শুনেছেন এবং নিজে গেয়ে আমাদের এই ‘প্রাণের মেলা’ রাঙিয়ে সার্থক করেছেন, তাদের সকলকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আপনাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসাই প্রবাসের মাটিতে আমাদের শিকড় ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার মূল প্রেরণা।”

কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছাড়া, কেবলই সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা এবং রবীন্দ্র-দর্শনের মেলবন্ধনে আয়োজিত এই “প্রাণের মেলা” অ্যাডিলেডের প্রবাসী বাঙালিদের মনে দীর্ঘকাল এক মধুর স্মৃতি হয়ে থাকবে।