অস্ট্রেলিয়ায় ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ডিফথেরিয়া প্রাদুর্ভাব: টিকাদানের হার বাড়াতে সহায়তা প্যাকেজ আনছে সরকার

ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য সরকারগুলো সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ডিফথেরিয়া প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সক্রিয় হয়েছে। একসময় প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে বলে ধরা হওয়া এই রোগের বিরুদ্ধে টিকাদান হার বাড়াতে কমনওয়েলথ সরকার একটি সহায়তা প্যাকেজ প্রস্তুত করছে।
এ বছর এখন পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াজুড়ে ২২০টিরও বেশি ডিফথেরিয়া সংক্রমণের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে। এর বেশিরভাগই নর্দার্ন টেরিটরিতে হলেও, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া, সাউথ অস্ট্রেলিয়া এবং কুইন্সল্যান্ডেও আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া গেছে। এছাড়া নর্দার্ন টেরিটরিতে ডিফথেরিয়া-সম্পর্কিত একটি মৃত্যুর তদন্ত চলছে। যদি সেটি নিশ্চিত হয়, তবে প্রায় এক দশকের মধ্যে এটিই হবে এই রোগে প্রথম মৃত্যু।

ফেডারেল স্বাস্থ্যমন্ত্রী Mark Butler বলেছেন, পরিস্থিতি “খুবই উদ্বেগজনক”। তিনি বলেন, “প্রেক্ষাপট বোঝাতে বলি, আমরা প্রায় ৩৫ বছর ধরে জাতীয়ভাবে এই রোগের সংখ্যা রেকর্ড করছি, এবং বিশাল ব্যবধানে এটিই ডিফথেরিয়ার সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব।”
ফেডারেল সরকার এখন একটি সহায়তা প্যাকেজ নিয়ে কাজ করছে, যার মূল লক্ষ্য হলো কমে যাওয়া টিকাদান হার বাড়ানো। ২০২৫ সালে নিয়মিত শিশু টিকাদানের হার — যার মধ্যে ডিফথেরিয়ার টিকাও রয়েছে — গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে।
মার্ক বাটলার আরও বলেন, “আরও বেশি টিকা এবং অতিরিক্ত স্বাস্থ্যকর্মী এই প্যাকেজের অংশ হবে। আমরা নর্দার্ন টেরিটরি সরকার এবং আদিবাসী নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি, কারণ এই প্রাদুর্ভাব মূলত এনটির আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু সংখ্যার দিক থেকেই গুরুতর নয়, আমরা যে নতুন সংক্রমণগুলো দেখছি তার বেশিরভাগই শ্বাসতন্ত্রজনিত ডিফথেরিয়া, যা অনেক বেশি বিপজ্জনক। প্রায় ২৫ শতাংশ রোগীকেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে।” তিনি সতর্ক করেন যে, এই পরিস্থিতি নর্দার্ন টেরিটরির হাসপাতাল ব্যবস্থার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে।

সেন্ট্রাল অস্ট্রেলিয়ান অ্যাবরিজিনাল কংগ্রেস স্বাস্থ্যসেবার জন বোফা বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতির মধ্যেই টিকাদান বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, “কোভিডের পর থেকে আমরা ভয়াবহ জনবল সংকটে আছি, এবং এখনো তা কাটিয়ে উঠতে পারিনি।” তিনি আরও জানান, “আমি যে বড় আদিবাসী স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করি সেখানে আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় ১০ জন পূর্ণকালীন জিপি কম আছে… এছাড়া প্রায় ২০টি নার্সিং পদেরও ঘাটতি রয়েছে।” তার মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মীর অসম বণ্টন মোকাবিলায় আরও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ দরকার।

ডিফথেরিয়া কী?
ডিফথেরিয়া একটি প্রাণঘাতী ও অত্যন্ত সংক্রামক ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। শ্বাসতন্ত্রজনিত ডিফথেরিয়া নাক, গলা ও শ্বাসনালিতে আক্রমণ করতে পারে, আর ত্বকজনিত ডিফথেরিয়া ত্বকে সংক্রমণ ঘটায়।
এটি কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ছড়ানো শ্বাসকণার মাধ্যমে, অথবা সংক্রমিত ক্ষতের সরাসরি সংস্পর্শে ছড়ায়।
অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা দেওয়া হলেও শ্বাসতন্ত্রজনিত ডিফথেরিয়ায় আক্রান্ত প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন মারা যায়।
ঐতিহাসিকভাবে, ডিফথেরিয়া বিশ্বজুড়ে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল। ন্যাশনাল সেন্টার ফর ইমিউনাইজেশন রিসার্চ অ্যান্ড সার্ভেইল্যান্স অস্ট্রেলিয়ার তথ্যমতে, ১৯২৬ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় ৪,০০০-এরও বেশি মানুষ এই রোগে মারা গিয়েছিল।
তবে ১৯৩০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ায় টিকাদান শুরু হয় এবং ১৯৫০-এর দশক থেকে রোগটি প্রায় নির্মূল বলে বিবেচিত হয়।
Peter Collignon, যিনি এএনইউ মেডিক্যাল স্কুলের সংক্রামক রোগ বিভাগের অধ্যাপক, বলেন এই পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার নয়।
তার মতে, কম টিকাদান হার একটি প্রধান কারণ হলেও, নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থার মানুষদের মধ্যে ডিফথেরিয়া বেশি ছড়ায়, কারণ অস্বাস্থ্যকর আবাসন ও অতিরিক্ত জনঘনত্ব রোগ বিস্তার সহজ করে তোলে।
তিনি বলেন, “সম্ভবত বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে… কম টিকাপ্রাপ্ত মানুষের বড় জমায়েতের মধ্যে বেশি সংক্রামক ব্যক্তি উপস্থিত ছিল, ফলে সংক্রমণ বেড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই ধরনের রোগে প্রতিরোধই সবচেয়ে ভালো উপায়। আর প্রতিরোধের অর্থ হলো সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করা এবং সবাইকে পূর্ণ টিকাদানের আওতায় আনা।”

অস্ট্রেলিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট Danielle McMullen বলেন, ডিফথেরিয়ার সংক্রমণ বৃদ্ধি টিকার গুরুত্ব আবারও সামনে এনে দিয়েছে।
তিনি বলেন, “টিকাদান আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় সাফল্য। কিন্তু টিকাদানের হার কমে গেলে, যেসব গুরুতর রোগ আমরা প্রায় নির্মূল করেছিলাম, সেগুলো আবার ফিরে আসতে পারে।” তিনি অস্ট্রেলিয়ানদের টিকাদানের অবস্থা যাচাই করতে এবং প্রয়োজনে তাদের নিয়মিত জিপির সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান।

Source: ABC news