কথোপকথন: সেই চিনচেনা কিন্তু অচেনা অঞ্জন দত্ত

বাংলা গান শুনেন এমন শ্রোতাদের কাছে অঞ্জন দত্ত শুধু একটি পরিচিত নাম না, অত্যন্ত প্রিয় একটি নামও বটে। যার গান কেবল গান নয়, একেকটি গল্প। গল্প মানেই শুধুই যে কাল্পনিক, তা নয়। জীবন থেকে সেঁচে আনা নানা ঘটনা কিংবা অতীতের জঞ্জাল, নস্টালজিয়া। খুব রাতে ঘুম পেলেও জেগে থাকার মতো তন্দ্রা, ডায়াল করা রং নাম্বার, আড়াইশ বর্গমাইলের শহরে প্রেমিকের কাঁধে প্রেমিকার মাথা রাখার হয়তো একটিমাত্র স্থান। তিনি স্বপ্ন দেখেন, আক্ষেপ আঁকেন, আফসোসের সুরে প্রাণদান করেন। চোখ বন্ধ করে ডুবে থাকা শ্রোতার কানে নয়, মনে ঢেলে দেন গল্পের নির্যাস। এক এক করে তারা সবাই আমাদেরও চেনা হয়ে যায়। মনে হয়, কত্তো পুরনো চেনাজানা মানুষকে নিয়ে গল্প বলা হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে- গল্পের প্রতিটি চরিত্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে। খুব কাছ থেকে জীবনটাকে নানা আঙ্গিকে দেখেছেন তিনি। মধ্যবিত্ত মানসিক দ্বন্দ্ব কিংবা স্বপ্ন, হেরেও হারটাকে না স্বীকার করা – এসব ব্যাপার উঠে এসেছে তার গানেও।

শিশু, ভবঘুরে কিশোর, বেকার যুবক, ঘর ছেড়ে পালাতে যাওয়া মেয়ে থেকে শুরু করে প্রান্তিক জীবনে পড়ে থাকা মানুষের গল্পও গানে এনেছেন। “মা গো আমার মা গো জানি, অনেক কষ্ট পাবে তুমি/ তবু আমার নেই কোনো উপায়…” ট্যাক্সিতে বসে থাকা প্রেমিকের হাত ধরে পালাতে চাওয়া মেয়েটি মাকে চিঠি লিখেছিলো। নাম তার রমা। টাকাওয়ালা ছেলের চেয়েও ভালবাসার ছেলেকেই প্রাধান্য দিয়েছিলো।

রমা কি পেরেছিলো সেদিন পালাতে? নাকি বাবা-কাকার পছন্দের বরের হাতেই পরতে হয়েছিলো সিঁথির সিঁদুর? জিজ্ঞাসা রয়েই যায়, উত্তর মেলে না।

মেরী অ্যানের “হাত দুটো গেছে ক্ষয়ে, গাল দুটো গেছে ঝুলে, নিয়মিত অবহেলায়”। রিপন স্ট্রিট আঁকড়ে ধরে পড়ে থাকা মেরী অ্যানের প্রতি বিন্দুমাত্র আকর্ষণ কমেনি ছেলেটির। তবে সেদিনও যেমন পারেনি ধর্ম-বর্ণের গণ্ডি পেরিয়ে ঐ কালো হাত দুটো ধরতে। এ যে কি অপূর্ণতা, এ যে কি স্বপ্নভঙ্গ, তা শুধু অঞ্জন দত্তের গানেই ছুঁয়ে যায় হৃদপিন্ড।

অঞ্জন দত্ত আসছেন, আর তার হাত ধরে আসছে আমাদের সেই হারানো বিকেলগুলো, প্রথম ব্রেক-আপের বিষণ্ণতা আর আকাশছোঁয়া রঙিন সব কল্পনা।

“রঞ্জনা আমি আর আসবো না, তাই দুপুরবেলাতে ঘুমিও। আসতে হবে না আর বারান্দায়” বলা ছেলেটির না আসার পেছনে তার ভীরুতাই হয়তো ধরা পড়ে, “বুঝবো কী করে তোমার ঐ মেজদাদা শুধু যে তোমার দাদা নয়!” তখন নিজের কৈশোর প্রেম মনে করে কত রঞ্জনা রয়ে যায় চিরচেনা গানগুলোয়। আর থেকে যায় অঞ্জন দত্তের গানের প্রতি শ্রোতাসমাজের আপাদমস্তক মুগ্ধতা।

“হ্যালো…এটা কি ২৪৪১১৩৯? দিন না ডেকে বেলাকে একটিবার/ মিটারে যাচ্ছে বেড়ে এই পাবলিক টেলিফোনে, জরুরি খুব জরুরি দরকার!” বেলা বোস কি কাঁদছে? সে কি শুনছে? নাকি শুনেও না শোনার ভান করছে? জানা হয় না আর, রয়ে যায় আরেক আঁজলা আক্ষেপ। একজন বেলা বোস, যিনি বাঙ্গালি প্রেমিক হৃদয়ের চিরন্তন হাহাকারের প্রতীক। একটা বাংলা গান এভাবে বেকার জীবন, মানব-মানবীর চিরন্তন প্রেমকে এভাবে ধারণ করতে পারবে, এতো সহজ শব্দ দিয়ে ঝংকার তুলবে, মনের দুয়ারে তা অবিশ্বাস্য।  জনপ্রিয় এই গানটি শোনেনি এমন মানুষ হয়তো কমই পাওয়া যাবে।

অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে অ্যাডিলেডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোয়াযার সোনোমাটোগ্রাম। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটি আয়োজন করেছে একাধিক উল্লেখযোগ্য কনসার্ট ও সিনেমার প্রর্দশনী, যা প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির প্রতি নতুন করে আগ্রহ ও আবেগ সৃষ্টি করেছে। এরই ধারাবাহিতকায় আসছেন “অঞ্জন দত্ত।

অঞ্জন দত্ত আসছেন, আর তার হাত ধরে আসছে আমাদের সেই হারানো বিকেলগুলো, প্রথম ব্রেক-আপের বিষণ্ণতা আর আকাশছোঁয়া রঙিন সব কল্পনা। আর সেই চিনচেনা কিন্তু অচেনা অঞ্জন দত্ত কথা বলেছেন “আমাদের কথা অষ্ট্রেলিয়া”র সাথে। সেই কথোপকথনটি তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য। এই সাক্ষাৎকারটি পেতে সহযোগিতা করেছেন কোয়াযার সোনোমাটোগ্রাম। ।

১. আপনার গান, চলচ্চিত্র ও লেখালেখিএই তিনটি মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করেন। কোন মাধ্যমটিতে আপনি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং কেন?

চলচ্চিত্র। প্রায় ১৩ বছর বয়স থেকে আমি অভিনেতা হতে চেয়েছিলাম। শিখেছি, বাদল সরকারের কাছে। ভালো থিয়েটার বা ভালো সিনেমা আমার সব থেকে প্রিয়। আমি তথাকথিত বাংলা কমার্শিয়াল সিনেমা পছন্দ করি না। ভালো সিনেমার দর্শক কম। তাই, সব সময় ভালো সিনেমা করে রোজগার হবে না। রোজগারের একটা অন্য রাস্তা খুঁজে নেবার জন্য গান করতে আসা।

২. “বেলা বোস” বা “রঞ্জনা”এই ধরনের চরিত্রভিত্তিক গানগুলোর অনুপ্রেরণা কোথা থেকে আসে? বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা কতটা প্রভাব ফেলে?

আমার গান কথা এবং সুরের দিক থেকে বাংলা আধুনিক গানের বা কবিতার ধারা থেকে আলাদা। আমার গান কলকাতা শহরের নাগরিক জীবনের গল্প। সেই গল্পের অংশ রঞ্জনা বা বেলা বোস।

৩. আপনার গানে শহুরে জীবনের এক বিশেষ গল্প ফুটে ওঠে। কলকাতা শহর আপনার সৃষ্টিশীলতায় কীভাবে প্রভাব ফেলেছে?

আমি একটা অনেকদিনের, ঐতিহাসিক, একসময়কার সাংস্কৃতিক রাজধানীতে বড় হয়েছি। আমার শহরের মধ্যে একটা বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক, সাংস্কৃতিক ছাপ ছিল, এখনও আছে। এই শহরের পুরোনো অলিগলি, দোকান, বাজার, নানা ধর্মের মধ্যবিত্ত মানুষ, পাড়া আমার গানে প্রকাশ পেয়েছে। সেই মানুষের হতাশা, আনন্দ, হেরে যাওয়া, জিতে যাওয়া, সুখ-দুঃখের গল্প নিয়ে আমার গান। এই জগতটা আমার চেনা, দেখা। গান লেখার জন্য সেটাকে চিনতে হয়নি। আলাদা করে প্রেমের গান বা প্রতিবাদী গান বলে কিছু নেই। আছে মানুষের বেঁচে থাকার কথা। আমার সুরেও সেভাবে কোনো নির্দিষ্ট ভারতীয় সঙ্গীতের ধারা নেই। বরং এই শহরে বসেই নানা বিদেশি গানের সুরের ধারা ঢুকে পড়েছে।

৪. সময়ের সঙ্গে বাংলা গানের ধরণ অনেক বদলেছে। বর্তমান বাংলা সংগীত নিয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?

আমি তো গানের পণ্ডিত নই! গানের সমালোচক বা তাত্ত্বিক নই। স্রেফ ভালো লাগা থেকে গান করেছি। যা ভালো লাগে শুনি, যা ভালো লাগে না, শুনি না।

৫. নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে, বিশেষ করে যারা নিজস্ব স্টাইল তৈরি করতে চায়?

নিজস্ব স্টাইল তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। নিজের কথা, নিজের শোনা জানা জায়গা থেকে গান তৈরি করা একজন শিল্পীর প্রাথমিক কর্তব্য। সেখানে বুদ্ধির প্রয়োজন, কৌতুক বোধের প্রয়োজন, সব রকমের সাহিত্য পড়া উচিত, জানা উচিত। নিজের রুচি উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি। বাজার কী খাচ্ছে বা খাবে, সেই ভেবে কোনো ভালো শিল্প তৈরি হয় না। সে গানই হোক বা সিনেমা।

৬. আপনি একাধারে গায়ক, পরিচালক ও অভিনেতাএই বহুমুখী কাজের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখেন?

আমি চেষ্টা করি যেটা আমার কাছে উন্নত মানের, সেটা করার। যে কোনো জলসায় গিয়ে গান আমি করি না। যে কোনো ছবিতে পার্ট করি না। ইদানীং গদ্যও লিখছি। ভালো লাগছে বলে। আমার কাছে রোজগার করা অত্যন্ত জরুরি, এখনো। কিন্তু যা-হোক-তা-হোক করে নয়। খারাপ সিনেমায় পার্ট করব না বলেই নিজের মত গান করতে আসা। মাঠে ঘাটে ময়দানে — যে কোনো জায়গায় গান করব না বলেই নিজের মত সিনেমা করতে চেয়েছি। নতুন গান অনেক লিখেছি, কিন্তু সেগুলো রেকর্ড করছি না, কনসার্টে গাইছি।

৭. আপনার ক্যারিয়ারের এমন কোনো মুহূর্ত কি আছে যা আপনাকে আজকের অঞ্জন দত্ত হয়ে উঠতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে?

ভাল মাস্টারমশাই। সে আমার স্কুলেই হোক, বাদল সরকারই হোক, মৃণাল সেনই হোক বা বিদেশি নাট্যকার।

৮. আপনার গানগুলিতে গল্প বলার একটি আলাদা ধরণ আছে। এই গল্প বলার স্টাইলটি কীভাবে গড়ে উঠেছে?

মার্কিন এবং বৃটিশ ব্যালাড শুনে। বাংলা গানে এই ধারাটা ছিল না। মার্কিন লোকসঙ্গীতে এই ধারাটা প্রবলভাবে ছিল এবং আছে। রাস্তার নাম নিয়ে গান, রাস্তা নিয়ে গান, বিভিন্ন মানুষের গল্প…

৯. ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংগীত বা চলচ্চিত্র প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন কি, যা নিয়ে ভক্তরা জানতে আগ্রহী? আপনার ভক্তদের জন্য কোনো বিশেষ বার্তা দিতে চাইবেন?

হ্যাঁ আমি বাদল সরকারকে নিয়ে একটা খুব ব্যক্তিগত ছবি তৈরি করছি, পুত্র নীলের প্রথম ছবিতে প্রযোজনার কাজ করছি এবং ‘প্রিয় বন্ধু’-র দ্বিতীয় পর্ব মঞ্চস্থ করছি। শ্রোতাদের ব্যাপারে বলতে পারি আমার শহর এবং শহরতলীর শ্রোতাদের রুচি পড়ে গেছে অনেক। কিছু মানুষ এখনও আছেন, যারা শিল্পীর কাছ থেকে উঁচু মানের কাজ প্রত্যাশা করেন। আমি তাদের জন্য গান করতে চাই, যারা শুধুমাত্র আমার ‘বেলা বোস’ শোনেন না।

১০. অঞ্জন দত্তের এমন কোন স্বপ্ন বা কাজ কি বাকি আছে যা তিনি এখনো করে উঠতে পারেননি?

বিদেশে গিয়ে গ্লোবাল বাঙালিদের নিয়ে একটা ছবি করা।

১১. গান নিয়ে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ বা প্রাপ্তি কী?

আক্ষেপ: সব জায়গায় ‘বেলা বোস’ গাইতে হচ্ছে। প্রাপ্তি: আমার সঙ্গে যারা বাজায়। নীল দত্ত, অমিত দত্ত, দেবপ্রতিম বক্সী।