অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয়ে কড়াকড়ি, ঝুঁকিতে বাংলাদেশও

অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার প্রক্রিয়া আরো কঠোর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিতে আবেদনকারীদের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও অনলাইন কার্যক্রমের গভীর যাচাইয়ের ইঙ্গিত থাকায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার আবেদনকারীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিরোধীদলীয় রাজনীতিক নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর অভিবাসন ব্যবস্থায় কঠোরতা আনার প্রস্তাব তুলে ধরে আশ্রয় আবেদনকারীদের পরিচয় ও কার্যক্রম যাচাইয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, ভিসা ও আশ্রয় আবেদন প্রক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতে আবেদনকারীদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, বক্তব্য এবং কার্যক্রম যাচাইয়ের সুযোগ বাড়বে। তবে অভিবাসন বিষয়ে বিজ্ঞজনদের মতে, প্রস্তাবিত নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব পড়তে পারে বিভিন্ন স্তরে। নতুন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে আবেদন প্রস্তুত আরও জটিল ও প্রমাণনির্ভর হয়ে উঠবে। চলমান আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে পারে এবং ভিসাধারীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। বিশেষ করে, যাদের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রকাশ্য বা অনলাইনে দৃশ্যমান, তাদের জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে। সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র বিষয়ক দপ্তর আশ্রয় আবেদন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর ব্যক্তিগতভাবে নির্যাতনের আশঙ্কা, প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে থাকে। সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, কেবল রাজনৈতিক পরিচয় নয় বরং আবেদনকারীর ব্যক্তিগতভাবে ঝুঁকির মুখে থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হয়।  অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসনবিষয়ক আইনজীবীদের মতে, ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যাচাই বাধ্যতামূলক হলে আবেদন প্রক্রিয়া আরো কঠোর ও তথ্যনির্ভর হয়ে উঠবে এবং পূর্বের কার্যক্রমের সঙ্গে বর্তমান দাবির অসামঞ্জস্য থাকলে তা আবেদন বাতিলের কারণ হতে পারে।
সিডনির বাংলাদেশি কমিউনিটির আবিদুর রহমান জানান, সাম্প্রতিক বাংলাদেশ থেকে আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কমিউনিটির একাংশ মনে করছেন, অতীতে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন এমন ব্যক্তিদের জন্য নতুন নীতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে কেউ বলছেন, যাদের প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তিগত ঝুঁকি রয়েছে এবং যারা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেন, তাদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন তেমন প্রভাব ফেলবে না। একজন আবেদনকারীর অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে কমিউনিটির অপর একটি সূত্র জানায়, তিনি দেশে সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই সংক্রান্ত ছবি ও তথ্য রয়েছে। বর্তমানে আশ্রয়ের আবেদন করতে গিয়ে তিনি শঙ্কায় রয়েছেন।
কারণ নতুন যাচাই ব্যবস্থায় তার পূর্বের অবস্থান তার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। যদিও এ ধরনের অভিজ্ঞতা যাচাইযোগ্য নয়, তবুও কমিউনিটির মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানগত দিক থেকে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে। যার একটি অংশ দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল থেকে আসে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, অনেক আবেদনই প্রাথমিক পর্যায়ে বাতিল হয়, প্রধানত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব বা বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতির কারণে। যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর হলে বাতিলের হার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এদিকে ‘নিরাপদ দেশ’ তালিকা নিয়ে আলোচনাও সামনে এসেছে। কোনো দেশকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলে সেই দেশ থেকে আসা আশ্রয় আবেদন সাধারণত কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং দ্রুত নিষ্পত্তির আওতায় আনা হয়। বাংলাদেশকে এই তালিকায় যুক্ত করার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও, এ ধরনের প্রস্তাবনা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় নতুন বাংলাদেশি আশ্রয় প্রাথনাকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, অতিরিক্ত যাচাই প্রক্রিয়া প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্যও জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ্যে তাদের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন না বা অনলাইনে সক্রিয় থাকেন না। ফলে কেবল অনলাইন উপস্থিতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে বাস্তব পরিস্থিতি পুরোপুরি প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভিবাসন ইস্যু ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। লিবারেল-ন্যাশনাল জোট এই বিষয়টিকে নির্বাচনী অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরছে, যেখানে সীমান্ত নিরাপত্তা ও ভিসা ব্যবস্থার কঠোরতার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রস্তাব রাজনৈতিক বিতর্ককে আরো তীব্র করে তুলছে।
এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার ভিসা মাইগ্রেশনের বিষয়ে পরামর্শক নাসির উদ্দিন বলেন, অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে আরো কঠোর, যাচাইকেন্দ্রিক এবং তথ্যনির্ভর হয়ে উঠছে। এতে একদিকে দুর্বল বা অসংগত আবেদন কমে আসতে পারে। অন্যদিকে প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা আরো বাড়বে। নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীত ভূমিকার চেয়ে ব্যক্তিগত ঝুঁকি প্রমাণই হয়ে উঠতে পারে আশ্রয় পাওয়ার প্রধান নির্ধারক।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী টনি বার্ক বলেছেন, অভিবাসন ছাড়া অস্ট্রেলিয়া “একদম ভিন্ন একটি দেশ” হয়ে যেত। অভিবাসনের সুফলগুলোর জোরালো ভাবে সমর্থন করেছেন। ফেডারেল সরকারের বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর ঘোষিত কঠোর নতুন অভিবাসন নীতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এসবিএস সুত্রে জানা যায়, বুধবার (১৬ এপ্রিল) সিডনিতে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী টনি বার্ক বলেছেন, আধুনিক অস্ট্রেলিয়া এবং বহুসাংস্কৃতিক অস্ট্রেলিয়া একই জিনিস। যখন মানুষ বলে যে তারা অস্ট্রেলিয়াকে ভালোবাসে এবং আমি বাসি আর এই মহাদেশের প্রায় সবাই-ই ভালবাসে তখন তারা আধুনিক অস্ট্রেলিয়াকেই ভালোবাসে। আমরা একটি বহুসংস্কৃতির দেশ এবং অভিবাসন ছাড়া আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দেশ হতাম। অন্যান্য স্থান থেকে আসা ব্যক্তিদের তুলনায় উদার গণতান্ত্রিক দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের অস্ট্রেলীয় মূল্যবোধ গ্রহণ করার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেলর মঙ্গলবারের বক্তৃতা তুলে ধরে বলেন, তার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নীতি বক্তৃতায় যুক্তি দিয়েছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন ব্যবস্থা “স্বার্থপর” আগন্তুকদের দ্বারা অপব্যবহারের শিকার হয়েছে। তিনি একটি কঠোর দমন অভিযানের প্রস্তাব করেছেন। যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল যাচাই-বাছাইয়ের মতো সমালোচিত একটি প্রক্রিয়া, আরও কঠোর নির্বাসন ব্যবস্থা এবং জাতীয় মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্যের কঠোর পরীক্ষা।
ক্যানবেরার মেনজিস রিসার্চ সেন্টারে তাঁর ‘অস্ট্রেলিয়ান ভ্যালুস মাইগ্রেশন প্ল্যান’-এর রূপরেখা তুলে ধরার সময় টেইলর বলেন, “বহুদিন ধরে আমরা অভিবাসন ও একীকরণের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে এসেছি। এরপর টেইলর ‘গাজাবাসী গোষ্ঠী’-কে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন এবং বলেন যে দুই ধরনের অভিবাসী রয়েছে। মহৎ ও দেশপ্রেমিক এবং রাষ্ট্রবিরোধী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যক্তিরা।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তৃতার তীব্র সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী টনি বার্ক আরো বলেছেন, যে এটি পলিন হ্যানসনের ওয়ান নেশন পার্টির সমর্থকদের খুশি করার একটি কৌশল। উদার গণতন্ত্রের এই ধারাটি অস্ট্রেলিয়াকে একটি ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে চাইছে। এবং আমরা সেরকম নই। আপনি কে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ আপনি কোথা থেকে এসেছেন তা নয়।
এনএসডব্লিউ কাউন্সিল ফর সিভিল লিবার্টিজ সভাপতি টিমোথি রবার্টসবলেছেন, বিরোধীদলীয় জোটের এই পরিকল্পনার নিন্দা করে এটিকে নাগরিক স্বাধীনতার উপর একটি “ট্রাম্পীয়” আক্রমণ বলে অভিহিত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া যাচাই করা এবং অস্পষ্ট ‘মূল্যবোধকে ভিসার একটি বাধ্যতামূলক শর্ত বানানো হলো কোয়ালিশনের একটি দুর্বল প্রচেষ্টা। যার মাধ্যমে তারা তাদের অপছন্দের অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নির্লজ্জভাবে বৈষম্য করতে চায়।
অস্ট্রেলিয়ার জন্য এই ভয়াবহ পরিকল্পনাটি বর্ণবাদে নিমজ্জিত এবং এটি আমাদের ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের প্রতি আহ্বান। যার জন্য আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। এটি এমন কোনো পরিকল্পনা নয় যা আমাদের অনুকরণ করা উচিত বলে মনে করেন কাউন্সিল সভাপতি।
ইসলামোফোবিয়া মোকাবেলায় অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ দূত আফতাব মালিক টেইলরের প্রস্তাবের সমালোচনায় যোগ দিয়ে এটিকে “ইসলামোফোবিক ধারণার উপর নির্ভরশীল” বলে বর্ণনা করেছেন। যা ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়কে কলঙ্কিত ও অমানবিক করে তোলে। রাজনৈতিক অঙ্গনের বিভিন্ন অংশে ক্রমবর্ধমান কঠোরপন্থী ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বক্তব্যের উত্থান আমাদের জাতির প্রকৃত সমস্যাগুলো মোকাবেলা করার পরিবর্তে বিভাজনকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করছে বলে এক বিবৃতিতে মালিক বলেছেন।