শিকড়ের টানে বৃষ্টিভেজা সকাল

শৌভনিক দত্ত: সেদিন আমাদের কথা (amaderkotha.com.au) -এ অ্যাডিলেড থেকে প্রকাশিত একটি নতুন বাংলা অনলাইন পত্রিকায় একটি লেখা পড়লাম, “নির্বাসনের বৃষ্টি ও শিকড়ের টান”। পড়তে পড়তেই মনে হলো, লেখক যেন আমাদের অনেক প্রবাসীর মনের কথাই তুলে ধরেছেন। দেশ ছাড়ার পর দেশকে আরও বেশি করে বুকের মাঝে পেতে চাওয়ার সেই অদ্ভুত আকুতি শব্দে শব্দে ধরা দিয়েছে সেখানে।

অনেকটা কবিগুরুর গানের মতোই, শ্রাবণ আকাশের ছলছল মেঘের ভেতর দিয়ে বিরহের দিগন্ত পেরিয়ে, যা কিছু দেখার বাইরে চলে গেছে, মন যেন তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। স্বপ্নে ভেসে ওঠে সেই অচেনা অথচ গভীরভাবে চেনা পৃথিবী। এ যেন এক নিঃশব্দ টান, যা আমরা বয়ে বেড়াই, কিন্তু খুব কমই উচ্চারণ করি।

প্রবাসের জীবন অনেকটাই বাস্তবতার নিরিখে মেপে নেওয়া। ঘড়ির কাঁটা মেপে চলা এই জীবনে হঠাৎ পাওয়া কোনো অলস সকাল তাই অমূল্য মনে হয়। সেদিনও তেমনই এক বৃষ্টিভেজা, মেঘে ঢাকা সকাল ছিল। ঘুম ভাঙার পর নিজেকে আর তাড়া দিতে ইচ্ছে করছিল না। সেই অলসতার ভেতরেই হাতের মুঠোয় এসে পড়ল “সম্পর্কের টান” নামে একটি নাটক।

নাটকটি ভালো লাগলো। আমি নাটকের বিশেষজ্ঞ নই, তাই এর গভীর বিশ্লেষণে না গিয়ে একজন সাধারণ দর্শক হিসেবেই বলছি, আমাদের নাটকগুলো অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেই তৈরি হয়, তাই অনেক সময় গল্পের ভেতরেই তার শক্তি খুঁজে নিতে হয়। কিছু নাটক ছোট্ট কোনো বার্তা দিয়ে শেষ হয়, আবার কিছু নাটক আমাদের অজান্তেই ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং দিয়ে যায় সাহিত্যের এক কোমল স্পর্শ। এই নাটকটি সেই দ্বিতীয় ধারার বলেই মনে হলো। কয়েকটি দৃশ্য আর সংলাপ দেখার অনেক পরেও মনে গেঁথে থাকে।

নাটকের সেই সহজ সম্পর্কের গল্পগুলো অজান্তেই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই গ্রামবাংলায়, যেখানে জীবন ছিল সহজ। আর আজ প্রবাসের এই ব্যস্ত জীবনে, অনেক কিছু পাওয়ার পরেও কোথায় যেন সেই সহজতার জায়গায় একটা অদৃশ্য শূন্যতা এসে বসেছে।

নাটকের সেই সহজ সম্পর্কের গল্পগুলো অজান্তেই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল সেই গ্রামবাংলায়, যেখানে জীবন ছিল সহজ। আর আজ প্রবাসের এই ব্যস্ত জীবনে, অনেক কিছু পাওয়ার পরেও কোথায় যেন সেই সহজতার জায়গায় একটা অদৃশ্য শূন্যতা এসে বসেছে। গাছপালায় ঘেরা ঘরবাড়ি, মানুষজন তাদের নিজস্ব ছন্দে বেঁচে আছে। অনেক বছর আগে পড়া শওকত ওসমানের “প্রদোষে প্রাকৃতজন” বইয়ের কিছু দৃশ্য আর শৈশবের অল্প দেখা গ্রামের স্মৃতি আবার চোখের সামনে ভেসে উঠলো।

বাংলার সেই গ্রামগুলোতে ইতিহাসের অংশ হিসেবেই ভয় আর প্রতারণা ছিল। তবুও মানুষের প্রতি সেই গভীর অবিশ্বাস ছিল না। একজন অপরিচিত মানুষও হয়ে উঠতে পারতো পরিবারের অতিথি। এক রাতের আশ্রয়ের জন্য কোনো সম্পর্কের প্রয়োজন হতো না। আতিথেয়তায় কোনো লেনদেনের বিষয় ছিল না, ছিল না AirB&B-এর মতো কোনো হিসেবনিকেশ। অতিথিকে গ্রহণ করা হতো সহজ বিশ্বাসে, মানবিকতার জায়গা থেকে। সেটাই ছিল মানুষের প্রতি বিশ্বাস আর আতিথেয়তার নৈতিক দায়িত্ব।

অনেক কবি সাহিত্যিকই বারবার ফিরে যেতে চেয়েছেন সেই সহজ জীবনে। হয়তো সেখানেই ছিল মানুষের ভেতরের স্বাভাবিকতা, অনাড়ম্বর বেঁচে থাকার আনন্দ। ছোট ছোট দুঃখ, ছোট ছোট আশা আর মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ টান।

হয়তো সেই কারণেই আজও, এত কিছু পাওয়ার পরেও, ভেতরের কোথাও একটা টান রয়ে যায়। শিকড়ের টান। এই টান কোনো যুক্তি মানে না, কোনো দূরত্ব মানে না। আমরা যেখানেই থাকি না কেন, এই টান আমাদের ভেতরে নিঃশব্দে বেঁচে থাকে। ঠিক বৃষ্টির পর মাটির গন্ধের মতো, অদৃশ্য কিন্তু গভীরভাবে অনুভবযোগ্য।

হয়তো সেই কারণেই আজও, এত কিছু পাওয়ার পরেও, ভেতরের কোথাও একটা টান রয়ে যায়। শিকড়ের টান। এই টান কোনো যুক্তি মানে না, কোনো দূরত্ব মানে না। আমরা যেখানেই থাকি না কেন, এই টান আমাদের ভেতরে নিঃশব্দে বেঁচে থাকে। ঠিক বৃষ্টির পর মাটির গন্ধের মতো, অদৃশ্য কিন্তু গভীরভাবে অনুভবযোগ্য।

কিন্তু আজ মনে হয়, বিষয়টা শুধু এতটুকু নয়। আমরা হয়তো ভাবি, আমরা শিকড়কে ভুলে গেছি। কিন্তু সত্যি কি তাই। হয়তো আমরা যত দূরে যাই, শিকড় ততই আমাদের ভেতরে জায়গা করে নেয়। আমরা দেশ ছেড়ে এসেছি ঠিকই, কিন্তু আমাদের ভেতরের মানুষটা এখনো সেই বৃষ্টিভেজা মাটিতেই দাঁড়িয়ে আছে।

আর সেই কারণেই, প্রবাসের কোনো এক নিঃশব্দ সকালে, কোনো কারণ ছাড়াই, হঠাৎ করে মনটা ভিজে ওঠে।

১২ এপ্রিল ২০২৬, অ্যাডিলেড, অস্ট্রেলিয়া