চৈত্র সংক্রান্তি: বসন্তের অবসান থেকে বৈশাখের আহ্বান

শৌভনিক দত্ত: বাংলার লোকজ বিশ্বাসে শোনা যায়, চৈত্র সংক্রান্তি শুধু বছরের শেষ দিন নয়, বরং এক সেতুবন্ধন। পুরোনো ও নতুনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃশব্দ মুহূর্ত। প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সমাজে এই সময় ছিল ফসল তোলার শেষ পর্যায়, হিসাব মিটিয়ে নতুন বছরের প্রস্তুতির সময়। ঘরদোর পরিষ্কার করা, পুরোনো জিনিস ফেলে দেওয়া, এমনকি তেতো খাবার খাওয়ার মধ্য দিয়ে একধরনের শুদ্ধির ভাবনা কাজ করত। কোথাও কোথাও গাজন বা চড়ক পূজার মতো আচার পালিত হতো, আবার গ্রামবাংলায় বসত সংক্রান্তির মেলা। জনশ্রুতি বলে, বছরের শেষ দিনে মানুষ শুধু হিসাবই মিটাত না, নিজের ভেতরটাকেও একটু গুছিয়ে নিত, যেন নতুনকে স্বাগত জানানো যায় নির্ভার হয়ে।

কিন্তু এই শেষের গল্প শুরু হয় অনেক আগেই, বসন্তে।

ফাল্গুন আর চৈত্র মিলিয়ে বসন্ত বাংলার সবচেয়ে প্রিয় ঋতু। পলাশ আর শিমুলের রঙে রাঙা প্রকৃতি, হালকা বাতাসে ভেসে আসা অকারণ ভালো লাগা, আর মানুষের মনে এক অদ্ভুত আবেশ। এই সময়টা যেন কোনো যুক্তি মানে না। মনে হয় সবকিছু একটু বেশি সুন্দর, একটু বেশি কাছের। যেন জীবন হঠাৎ করেই রসে ভরে ওঠে। এই রস, এই মায়া, এই অকারণ আনন্দই বসন্তের আসল পরিচয়।

তবু এই সৌন্দর্য স্থায়ী নয়। বসন্তের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে তার শেষের আভাস। ফুল ফোটে, আবার ঝরে যায়। যে মাধবীমঞ্জরী রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে ঝরে পড়ে, তাকে কি সাজিয়ে রাখা যায়? যা চলে গেছে, তাকে ধরে রাখার চেষ্টা কি সত্যিই কোনো অর্থ বহন করে? জীবনের অনেক কিছুই এমনই ক্ষণিক, আর হয়তো সেই ক্ষণিকতার কারণেই তার মূল্য এত বেশি।

তবু এই সৌন্দর্য স্থায়ী নয়। বসন্তের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে তার শেষের আভাস। ফুল ফোটে, আবার ঝরে যায়। যে মাধবীমঞ্জরী রাতের অন্ধকারে নিঃশব্দে ঝরে পড়ে, তাকে কি সাজিয়ে রাখা যায়? যা চলে গেছে, তাকে ধরে রাখার চেষ্টা কি সত্যিই কোনো অর্থ বহন করে? জীবনের অনেক কিছুই এমনই ক্ষণিক, আর হয়তো সেই ক্ষণিকতার কারণেই তার মূল্য এত বেশি।

এই রঙিন সময় ধীরে ধীরে বদলে যায়। বাতাস ভারী হতে থাকে, মাটির আর্দ্রতা শুকিয়ে যায়, আকাশে তাপের দপদপে ঝিলিক। চৈত্রের শেষে এসে প্রকৃতি যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। প্রখর তপনতাপে আকাশ তৃষায় কাঁপে, বায়ু করে হাহাকার। মানুষ যেন এক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসে দাঁড়ায় এক অদৃশ্য দরজার সামনে। ডাকে, খোলো দ্বার। কিন্তু কোনো সাড়া মেলে না। এই সময়টায় অপেক্ষাই যেন একমাত্র সত্য।

তারপর একদিন হঠাৎ সব বদলে যায়।

দূরে কোথাও জমে ওঠে মেঘ, বাতাসে অস্থিরতা, আর আচমকা নেমে আসে ঝড়। কালবৈশাখী শুধু প্রকৃতির রূপান্তর নয়, এটি এক তীব্র মুক্তি। ধুলো উড়িয়ে, পুরোনো পাতা ঝরিয়ে, ক্লান্তিকে ভেঙে দিয়ে সে নতুনের জন্য জায়গা করে দেয়। এই ভাঙনের মধ্যেই আছে এক ধরনের আনন্দ, আবার এক ধরনের ভয়ও। যেন সবকিছু একসাথে শেষ হয়ে যাচ্ছে, আবার ঠিক সেই মুহূর্তেই নতুন কিছু জন্ম নিচ্ছে।

এরপর আসে বৈশাখ।

রুদ্র, ভৈরব, নির্দয় বৈশাখ। সে যেন এক বৈরাগী সন্ন্যাসী, যার কাজ পুরোনোকে দাহ করা। বিগত বছরের সমস্ত ক্লান্তি, ব্যর্থতা, জমে থাকা আবর্জনা সে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। মানুষ নিজেই তাকে ডাকে। এসো হে বৈশাখ, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক। এই আগুন ধ্বংসের জন্য নয়, শুদ্ধির জন্য। অগ্নিস্নানে পৃথিবীকে নতুন করে প্রস্তুত করার জন্য।

আর সেই আগুনের ভেতর দিয়েই একসময় নেমে আসে শান্তি। রুদ্রতার ভেতর থেকে জন্ম নেয় করুণা। ধীরে ধীরে ফিরে আসে সবুজ, ফিরে আসে জীবন। দহন শেষে যে প্রশান্তি, সেটিই হয়তো নতুন বছরের আসল উপহার।

বাংলার ঋতুচক্র তাই শুধু প্রকৃতির পরিবর্তনের গল্প নয়। এটি মানুষের নিজের ভেতরেরও এক যাত্রা। বসন্তের প্রেম, চৈত্রের ক্লান্তি, ঝড়ের ভাঙন, আর বৈশাখের শুদ্ধি মিলিয়ে তৈরি হয় জীবনের এক পূর্ণ বৃত্ত।

অ্যাডিলেডের এই দূর প্রবাসে বসেও যখন চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরু মনে পড়ে, তখন বুঝতে পারি, এই চক্র শুধু বাংলার মাটিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের ভেতরেই বয়ে চলে। আমরা সবাই কোনো না কোনো বসন্ত পার করি, কোনো না কোনো চৈত্রে ক্লান্ত হই, কোনো ঝড়ে ভেঙে পড়ি, আর একদিন নিজের মতো করে নতুন হয়ে উঠি।

হয়তো সেই কারণেই, বছরের শেষে দাঁড়িয়ে আমরা এখনো অজান্তেই প্রস্তুত হই। কিছু ছেড়ে দিতে, কিছু ভুলে যেতে, আর নতুনকে স্বাগত জানাতে।

এভাবেই সময় এগিয়ে চলে। রস থেকে দহন, দহন থেকে পুনর্জন্ম।