টিম হিল (আবদুল্লাহ তাহমিদ ইয়াহিয়া): আমি যখন প্রথম বাংলাদেশে আসি, তখন কী আশা করা উচিত তা নিয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আমি বিশৃঙ্খলা, সৌন্দর্য, মানুষ এবং খাবার সম্পর্কে নানা গল্প শুনেছিলাম, কিন্তু এই দেশটি কীভাবে আমার হৃদয় জয় করবে, তার জন্য কিছুই আমাকে সত্যিকারের প্রস্তুত করতে পারেনি। কোনো একটি জায়গায় প্রথমবার গেলে যে স্মৃতিগুলো মনে গেঁথে যায়, সেগুলো সত্যিই ভিন্নরকম।
প্রথমবার ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে, সেই সুশৃঙ্খল বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে কাস্টমস পার হওয়া, নিজের ব্যাগ খুঁজে পাওয়া এবং বিমানবন্দরের কর্মীদের খুঁজে পাওয়া—যারা নির্ধারিত মূল্যে আপনাকে সাহায্য করবে—এসব অভিজ্ঞতা ছিল নতুন। বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর দেখলাম চারদিকে মানুষ, সবাই তাদের প্রিয়জনদের জন্য অপেক্ষা করছে। ট্যাক্সি চালকরা একজন বিদেশি দেখে আমাকে ঘিরে ধরল, নানা রকম প্রস্তাব আর ভাড়ার কথা বলল।
আমি একজন চালক বেছে নিলাম এবং গুগল ম্যাপসে দেখলাম, আমার হোটেল মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে। আধা ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর মনে হচ্ছিল আমাকে যেন অপহরণ করা হচ্ছে! কিন্তু আবার গুগল ম্যাপস দেখে বুঝলাম, ঢাকা আসলে এক বিশাল ট্রাফিক জ্যাম, আর আমার চালক তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে আমাকে হোটেলে পৌঁছে দিতে।
প্রথমবার রংপুরে যাওয়ার সময়, যেখানে আমি আমার স্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলাম, সকালের কুয়াশা ঢাকা ধানক্ষেতগুলো ছিল এক শান্তিময় দৃশ্য। প্রথমবার চাদর এবং পাঞ্জাবি পরার অভিজ্ঞতা, চায়ের কাপ, আর প্রথমবার ইলিশ মাছের স্বাদ—নরম ও সুস্বাদু, ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা, আর ঘরে তৈরি খাবারের উষ্ণতা—এসব স্মৃতি আমার মনে চিরকাল থাকবে।
আমি আমার স্ত্রীর শহর রংপুরে বহুবার গিয়েছি, এবং এটি এখন আমার দ্বিতীয় বাড়ির মতো মনে হয়। আমার স্ত্রীর পরিবার আমাদের সবসময় এমনভাবে স্বাগত জানায়, যেন আমরা কখনোই দূরে ছিলাম না। পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে টেবিল ভর্তি খাবার আর আমার প্রিয় মিষ্টি দই থাকে।
ঢাকা শহরের তুলনায় রংপুর অনেক শান্ত। এখানে আমি রাস্তায় হাঁটতে পারি, মানুষ আমাকে “আসসালামু আলাইকুম” বলে সম্ভাষণ জানায়, অথবা হাসিমুখে কথা বলে—বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে। শহরটি রঙ, শব্দ, জীবন, সদ্য ভাজা সিঙ্গারা আর ডালপুরিতে ভরপুর। রিকশাগুলো সরু রাস্তা দিয়ে চলাচল করে। আজান ধ্বনি যখন ভেসে ওঠে, তখন মানুষ নামাজে যায়, আর শহরের গতি কিছুটা ধীর হয়—তবুও শহর থেমে থাকে না। রংপুরকে পুরোপুরি আবিষ্কার করতে আমার হয়তো সারা জীবন লেগে যাবে। প্রতিবারই যখন আমি এই শহরের রাস্তায় হাঁটি, নতুন কিছু আবিষ্কার করি।
কক্সবাজারে আমার অভিজ্ঞতা ছিল এক শান্তিপূর্ণ অবকাশ। এটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শান্ত সমুদ্র সৈকত এবং স্থানীয় সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্র সৈকত—যা পৃথিবীর দীর্ঘতম—এই স্থানটিকে বিশেষ করে তুলেছে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে এটি খুবই জনপ্রিয়। আমরা শুনেছিলাম, কক্সবাজারের সূর্যাস্ত নাকি সত্যিই দৃষ্টিনন্দন। সৈকত ধরে হাঁটার সময়, রেস্তোরাঁ, পর্যটক দোকান এবং শুকনো মাছের দোকান পার হয়ে আমরা সেই শান্তির আবেশ অনুভব করছিলাম।
সাদা বালির উপর দাঁড়িয়ে আমরা সূর্যাস্ত দেখলাম। আমার স্ত্রী আর আমি সেই মুহূর্ত উপভোগ করছিলাম, চারপাশের কোলাহল যেন মিলিয়ে যাচ্ছিল। কমলা রঙের সূর্য যখন ঢেউয়ের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল, আর একটি মাছ ধরার নৌকা পাশ দিয়ে যাচ্ছিল—তখন প্রকৃতির সৌন্দর্য আমরা নিখুঁত শান্তিতে অনুভব করছিলাম।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ একটি লুকানো
রত্ন, আর সেখানে যাওয়ার যাত্রাটিও ছিল রোমাঞ্চকর। আমরা একটি ভালো জাহাজে টিকিট কেটেছিলাম, কিন্তু আমার স্ত্রী জোর করে বলেছিল আমরা যেন জাহাজের উপরের ডেকে থাকি, যাতে কিছু হলে দ্রুত বের হওয়া যায়। বাংলাদেশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর অভাব আমি প্রথমবার এখানে অনুভব করি। আমি ধৈর্য ধরে খাবার ও পানীয় অর্ডার দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু আশেপাশের মানুষজন চারদিক থেকে অর্ডার দিচ্ছিল। সৌভাগ্যবশত, একজন সদয় ব্যক্তি আমার বিভ্রান্তি বুঝতে পেরে আমাকে সামনে নিয়ে গিয়ে অর্ডার দিতে সাহায্য করলেন। কক্সবাজার থেকে বঙ্গোপসাগরের পানির ওপর দিয়ে জাহাজ ভ্রমণ ছিল খুবই শান্তিপূর্ণ—সমুদ্রের পাখি আমাদের পাশে উড়ছিল, আর লোনা বাতাস চুলে লাগছিল। যদিও আমার স্ত্রীর জাহাজ ডুবে যাওয়ার গল্পগুলো কিছুটা ভীতিকর ছিল!
জাহাজ থেকে নামার সময় আরও রোমাঞ্চ অপেক্ষা করছিল। সরু কাঠের তক্তা দিয়ে এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে উঠতে হচ্ছিল, হাতে স্যুটকেস নিয়ে—মনে হচ্ছিল যেন আমি কোনো জলদস্যু! অবশেষে এই চ্যালেঞ্জ পার করে আমরা সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পৌঁছালাম। সাদা নরম বালিতে পা রাখতেই বুঝলাম, আমি এক বিশেষ জায়গায় এসেছি। এখানকার পানি শুধু নীল নয়, একেবারে স্বচ্ছ। চারপাশে রঙিন মাছ ধরার নৌকা, কোনো গাড়ির শব্দ নেই, শুধু ঢেউয়ের শব্দ আর নারকেল গাছের পাতার মৃদু শব্দ—সব মিলিয়ে এক শান্ত পরিবেশ। এই দ্বীপের সৌন্দর্য সত্যিই মনমুগ্ধকর।
বাংলাদেশকে আমার পরিবার ও বন্ধুদের কাছে বর্ণনা করা সবসময়ই কঠিন। এটি একটি সুন্দর দেশ, যেখানে সংস্কৃতি ও মানুষের আন্তরিকতার এক অনন্য মিশ্রণ রয়েছে। আপনি যখন বাংলাদেশে আসবেন, তখনই মানুষের উষ্ণতা আপনাকে ঘিরে ধরবে। তারা অতিথিদের পরিবারের সদস্যের মতো গ্রহণ করে এবং চা, মিষ্টি বা পিঠা দিয়ে আপ্যায়ন করে। এই আতিথেয়তা শুধু একটি প্রথা নয়, এটি তাদের জীবনধারা। বাংলাদেশের মানুষ শক্তি, দয়া, সৃজনশীলতা এবং হৃদয়ের এক অপূর্ব সমন্বয়। তারাই এই দেশটিকে আমার কাছে এত বিশেষ করে তুলেছে। তাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটালেই বুঝতে পারবেন—বাংলাদেশ শুধু একটি দেশ নয়; এখানকার মানুষই বাংলাদেশকে সত্যিকারের বিশেষ করে তোলে।