পোর্ট ব্রটনের সেই রাত: ১৮৮৮-র হোটেল ও এক অশরীরী গল্প

মাকসুমুল হক: দু সপ্তাহের স্কুল ব্রেক। মাঝখানে লং উইকেন্ড। তাড়াহুড়ো প্ল্যানে এক রাতের জন্য পাওয়া গেল পোর্ট ব্রটন ক্যারাভান পার্কের একটি ক্যাবিন। ছ’জন পর্যন্ত থাকা যাবে এখানে। এদিকে আমরা সাতজন – আমরা চার জন, ছোট ভাইয়ের পরিবারে তিন জন। বাড়তি একজনের জন্য আশেপাশে পাওয়া গেল পোর্ট ব্রটন হোটেল। ডাবল রুম, কমন ওয়াশরুম। এদিক ওদিক না ভেবে বুকিং দিয়ে দিলাম। ঠিক করলাম বাচ্চারা সহ ছোট ভাইয়ের পরিবার থাকবে ক্যারাভান পার্কের ক্যাবিনে। আমি আর সহধর্মিণী উঠবো হোটেলে। স্কুল হলিডে সিজনে একোমোডেশন পাওয়া বেশ কঠিন। কিছু একটা পাওয়া গেছে মন্দ কী! বাসা থেকে ঘণ্টা তিনেক গাড়ি চালিয়ে পোর্ট ব্রটন। বের হতেই দেরি হয়ে গেছে। পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল পাঁচটা। প্রথমে ক্যারাভান পার্কে চেক ইন করে গেলাম হোটেলে। সন্ধ্যায় রিসেপশন খোলা থাকবে না তাই আগেভাগে চাবি নিতে গেলাম। গাড়ি পার্ক করে রিসিপশন রুম পেলাম না। এদিক সেদিক ঘুরে দেখলাম বার খোলা। ঢুকে গেলাম সেখানে। কান্ট্রি টাউন হওয়ায় একটা লেইড-ব্যাক ভাইব। আলো আঁধারি পরিবেশ। এখানে ওখানে দু-চারজন বসে। চাকচিক্য নেই, মধ্যবয়স পেরুনো সাদামাটা মানুষজন। কাউন্টারের মহিলার অনাবৃত হাতের প্রায় পুরোটাই উল্কি। রিসেপশন কোথায় জিজ্ঞেস করতে নাম জানতে চাইলো। তারপর ডিজিটাল রেজিস্টার দেখে চাবি দিয়ে দিল। বললো উপর তলায় সাত নাম্বার ঘর। ১৮৮৮ সালের হোটেল এটি। কাঠের মেঝেতে পুরনো কার্পেট। হাঁটলে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে। সে দেখিয়ে দিল একই চাবি দিয়ে হোটেলের প্রধান দরজা এবং রুমের দরজা খোলা যায়। কোন অদ্ভুদ কারণে সে আমাকে জন বলে সম্ভোধন করছিল। সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে রিসেপশনিস্ট কাম বারটেন্ডার আবার বারে চলে গেল। দোতলায় উঠে শেষ মাথায় রুম। চাবি দিয়ে খুলে সব স্বাভাবিক মনে হল। শুধু হালকা একটা পুরনো গন্ধ। স্বাভাবিক কেন বললাম, আসছি সে কথায়।

আগের দিন এক পারিবারিক দাওয়াতে স্ত্রীর দেখা হয় একজন বাংলাদেশি মহিলার সাথে যিনি পরিবার নিয়ে থাকেন পোর্ট ব্রটন এ। কোন কাজে এডেলেড এসেছেন। যখন শুনলেন আমরা বুকিং দিয়েছি হোটেলটিতে তখন বললেন বেশ কিছুদিন তিনি কাজ করেছেন সে হোটেলে এবং কয়েকটি রাতও কাটিয়েছেন। বললেন, এ হোটেলে ভুত আছে। কয়েক রাতে অশরীরী কিছুর উপস্থিতি প্রকটভাবে অনুভব করেছেন। প্রথম কয়েকদিন মনে হতো রাতে কেউ যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে উপরতলায়। এরপর একরাতে ঘুমের ঘোরে মনে হয় কেউ যেন শরীর ছুঁয়ে দিচ্ছে। ঘুম ভেঙ্গে ধড়ফড় করে উঠে গেলে অনুভব করেন পুরো রুমে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে গেছে। পরদিন সকালেই সে হোটেল ছাড়েন। আর কখনো থাকেন নি। স্ত্রী গল্প শুনেই ফোন দেন আমাকে। আমি তখন ওভারনাইট ক্যাম্পিং এ। পুরো গল্প শুনে আমার মনে হয় অসম্ভব কিছু না দেড়শ বছরের পুরনো হোটেলে, কিছু থাকলেও থাকতে পারে। কিন্ত মুখে বললাম – “আরে ভুত-প্রেত থাকলে হোটেলের ভাড়া আরও বেশি হতো। এই জামানায় ফ্রিতে কেউ কিছু দেয় না”। কথা শেষ করে ভাবলাম দেখি তো হোটেলের রিভিউগুলোতে কিছু পাওয়া যায় কি না। সাড়ে ছশো রিভিউ থেকে শুধু একটা রিভিউ পেলাম যেটাতে বলা – “ Staff were friendly and told us about George, the friendly ghost who lives upstairs” যা আছে কপালে দেখা যাক।

হোটেল রুম দেখে তালা লাগিয়ে সিঁড়ির পাশ দিয়ে গিয়ে লম্বা ব্যালকনি। পুরনো দিনের লোহার বালুস্ট্রেড সাদা নকশা কাটা ঘেরা। দেখেই মন ভরে গেল। হোটেল থেকে বেরিয়ে আবার ক্যারাভান পার্কে গিয়ে লাঞ্চ করে সবাইকে নিয়ে চলে গেলাম ঘণ্টা খানেকের দূরত্বে পোর্ট হিউজ জেটি। সারি সারি দাঁড়িয়ে মাছ ধরার ছিপ ফেলছে সবাই। পাশাপাশি কাঁকড়া ধরার ফাঁদ। মাছও পাচ্ছে সবাই টুকটাক। জেটি হেঁটে এসে পাশে সাউথ বীচ। চেয়ার পেতে বসে সন্ধ্যার চা খেতে বসে ড্রোন ওড়ালাম। এদিক ওদিক ঘুরিয়ে জেটির শ্যুট করছি। কিছুদুর ওড়াবার পরেই কন্ট্রোল বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এরপর আর কোনভাবেই সংযোগ করতে পারলাম না ড্রোনের সাথে। “ফাইন্ড মাই ড্রোন” অপশনে ক্লিক করে হেঁটে হেঁটে স্পটে গিয়ে দেখি তা জেটির পাশের একটি ম্যাপ ফোকাস করছে। সেখানে এক বুক পানি। স্রোতও অনেক। কাছাকাছি একজন ছিপ গুটিয়ে চলে যাচ্ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম কোন ড্রোন চোখে পড়েছে কি না। সে পাশেই একদিক দেখিয়ে বললো ঝপ করে অনেক উপর থেকে কিছুক্ষণ আগে কিছু একটা এখানে পড়েছে। নিশ্চিত হলাম ড্রোনের সলিল সমাধি হয়েছে।

ফিরে এসে চা শেষ করে ফিরে গেলাম কেবিনে। ডিনার শেষ করতে করতে এগারোটা। সহধর্মিনী সহ হোটেলে এসে সামনের রাস্তার পার্কিং এ দেখি আমাদের ছাড়া শুধু আরেকটা গাড়ি। ধরে নিলাম সম্ভবত আমরা ছাড়া আরেকটি মাত্র রুমে গেস্ট এসেছে। এইরকম ব্যস্ত সময়ে যেখানে কোথাও রুম পাওয়া যায় না সেখানে এটা প্রায় খালি দেখে একটু খচ করে লাগলো। চাবি দিয়ে খুলে লাগেজ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে রুমে গেলাম। মধ্যরাতে আমাদের হাঁটার ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ আরও জোরালো শোনা গেল। রুম থেকে বেরিয়ে আরেকটি রুমের পর ওয়াশরুম। ঐ রুমটিতে দরজায় লিখা – স্ট্রিক্টলি রেস্ট্রিকটেড। পুরুষ মহিলা ওয়াশরুম আলাদা। দুজন একসাথে পুরুষদের পাশটায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে হালকা চিপস বাদাম সাথে নিয়ে বারান্দায় গেলাম। দরজায় লিখা রাত এগারোটা থেকে সকাল সাতটা পর্যন্ত বারান্দা বন্ধ থাকবে। তখন রাত বারোটা, দরজা খোলা। বারান্দার পাশেই বড় একটি রুম। তাতে বড় করে লিখা প্রাইভেট। বারান্দায় চেয়ার টেনে বসে দুজন সময় কাটালাম ঘণ্টা খানেক। রাস্তা পেরুলে সামনেই পোর্ট ব্রটন জেটি। একসময় নিশ্চয় এ হোটেলের অতিথি হয়ে উঠতো বন্দরে নামা নাবিক এবং ক্রুরা। জেটি, সাগর, রাস্তা সব তখন ঘুমিয়ে। একজনকে দেখা গেল এতো রাতে জেটি ধরে হেঁটে যাচ্চে। শরীর যেন ক্লান্ত। আস্তে আস্তে হেঁটে সে মিলিয়ে গেল একসময়। আমরা রুমে ফিরে আসলাম। এতোটা সময় কোন জনপ্রাণীর দেখা মিললো না আর কোথাও। বাকি রাত কেটে গেল ঘুমে। সকালে উঠে শুনলাম স্ত্রীর ঘুম ভেঙ্গে গেছে দুঃস্বপ্ন দেখে। ভালো ঘুম হয় নি। নাস্তা করে লাগেজ নিয়ে চেক আউট করলাম। দেড়শ বছরের পুরনো হোটেলে আমাদের যাত্রাবিরতি এভাবেই শেষ।

পরদিন আলো ঝলমলে বসন্তের দিন। সবাই মিলে ব্রটন জেটিতে মাছ ধরার চেষ্টা। বিফল হয়ে গাড়ি করে পিংক লেক বুমবুংগা। সল্ট লেকটিতে বেশ ভালো রঙ এসেছে এরিমধ্যে। সামারে আরও চমৎকার হয়ে উঠবে লেকটি। তারপর ক্লেয়ার ভ্যালি হয়ে বুররা। চারদিকে বসন্তের আমেজ। বুনো ফুল শোভা ছড়াচ্ছে পাহাড়ে পাহাড়ে। বাসাবাড়ি রঙিন করে রেখেছে ফ্রন্টইয়ার্ডের হরেক রকম ফুলের বাগান। লুক আউট থেকে দূরে চোখে পড়ে ক্যানোলা ফিল্ড। ছোটভাই বললো – ইয়েলো হাইলাইটার দিয়ে যেন দাগ টেনে দিয়েছে কেঊ জমিনের এপার ওপার। শেষ স্পট বুররা মাইন দেখে ফেরার পথে সন্ধ্যার সাথে দিগন্ত ফুঁড়ে উঠে আসে প্রকান্ড চাঁদ। কাছাকাছি পার্কে সন্ধ্যার চা শেষ করে বাড়ির পথে।