যেখানে মেঘেদের বসবাস: জর্জিয়ার পথে প্রান্তরে

মাকসুমুল হক: ৩১ শে মে, ২০১৯। শারজাহ থেকে ফ্লাইটে জর্জিয়ার রাজধানী টিবলিসি পৌঁছাই সন্ধ্যায়। বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকায় বেশ খানিকটা অতিরিক্ত সময় নষ্ট হয় এয়ারপোর্টে। বের হয়ে দেখি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে আমার এয়ারবিএনবির হোস্ট ডেবিট। বিশ বাইশের তরুণ। এটা আমার সর্বপ্রথম এয়ারবিএনবির সাথে পরিচয়। গাড়ি চালিয়ে ডেবিট তার বাসায় নিয়ে এলো। তিবলিসি শহরের দুটো ভাগ – ওল্ড টিবলিসি এবং নিউ টিবলিসি । ওদের বাসাটা পুরনো অংশে। বেশ পুরনো একটি দালানের সামনে একতলা নতুন গেস্ট হাউজ। পুরনো দালানটিতে ওরা একান্নবর্তী পরিবার বাস করে। ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ম্যাপ ধরে কাছাকাছি একটা স্থানীয় পাব। মোটামুটি মানুষের ভীড়। কথাবার্তা চালাতে গিয়ে বেশ সমস্যায় পড়তে হল। ইংরেজি খুব ভালো বোঝে না মানুষজন। এদের ভাষা জর্জিয়ান বা রাশান। জর্জিয়ান লিখিত স্ক্রিপ্ট দেখতে অনেকটা মালায়লাম স্ক্রীপ্টের মতো। ডিনার সেরে কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে এসে ঘুমিয়ে পড়ি।

নাস্তা সেরে সকালের ঝলমলে আলোয় বেরিয়ে পড়ি।বসন্তের শেষ, আকাশ হালকা নীল, বাতাসে গ্রীষ্মের তেজ অল্প করে জানান দিতে শুরু করেছে। ম্যাপে সব স্পটগুলো একটার পর একটা বসিয়ে হাঁটা শুরু ওল্ড টিবিলিসির পথে। প্ল্যান সারা শহর পায়ে হেঁটে ঘোরা। শহরের এই অংশের জন্ম প্রায় চতুর্থ শতকে, যখন ইবেরিয়ান রাজা ভাখতাং গোরগাসালি এখানে গরম ঝরনা আবিষ্কার করেন। “টিবিলিসি” নামটিই এসেছে জর্জিয়ান শব্দ “Tbili” থেকে, যার অর্থ “উষ্ণ”। সরু আঁকাবাঁকা গলি, কাঠের বারান্দা আর লাল টালির ছাদে সাজানো ঘরগুলো এখনো সেই প্রাচীন সময়ের ছাপ বহন করে।

শহরের পুরোনো অংশ পেরিয়ে চোখে পড়ে নতুন টিবলিসির আধুনিকতার প্রতীক—ব্রিজ অফ পিস। ২০১০ সালে নির্মিত এই কাচ-ইস্পাতের সেতুটা শুধু আর্কিটেকচারের নিদর্শন নয়, বরং টিবিলিসির রূপান্তরেরও গল্প বলে। কুরা নদীর ওপরে দাঁড়িয়ে যখন দুই প্রান্ত দেখি—একপাশে পুরোনো টিবিলিসির ইতিহাস, অন্যপাশে নতুন শহরের আধুনিক স্থাপত্য — যেন সীমানায় দাঁড়িয়ে দুটো সময়ের স্বাক্ষী হওয়া।

 

সেতু পেরিয়ে রাইক পার্ক। এখানে মানুষজন অবসর সময় কাটায়, শিশুরা খেলে, আর নদীর ধারে বসে অনেকেই শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই পার্ক থেকেই বিখ্যাত কেবল কারে চেপে নারিকালা দুর্গে যাওয়া যায়, যে দুর্গের জন্ম অষ্টম শতকে। দূর থেকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্গটা এখনো শহরকে পাহারা দিচ্ছে।

এরপর পা বাড়ালাম হোলি ট্রিনিটি ক্যাথেড্রাল বা “সামেবা” গির্জার দিকে। ২০০৪ সালে উদ্বোধন হওয়া এই গির্জা দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ক্যাথেড্রাল, আর একে টিবিলিসির প্রতীক হিসেবেই ধরা হয়। ভেতরে ঢুকতেই পিনপতন নিস্তব্ধতা। আইকন আর দেয়ালচিত্রের মাঝে দাঁড়িয়ে মনে হবে, এই স্থান কেবল প্রার্থনার নয়, বরং ইতিহাস আর বিশ্বাসের মিলনস্থল।

দুপুরের দিকে পৌঁছালাম আর্ট প্যালেস-এ। এটি উনবিংশ শতকে রাজকুমার ওলগা ও কনস্তান্তিনের জন্য নির্মিত হয়, পরে এটি জর্জিয়ার থিয়েটার, সঙ্গীত ও সিনেমার জাদুঘর হয়ে ওঠে। পুরোনো নাটকের পোশাক, কাগজে আঁকা সেট ডিজাইন, বিরল পাণ্ডুলিপি আর সঙ্গীতযন্ত্রের প্রদর্শনী। প্রতিটি কক্ষ যেন একেকটি শিল্পযাত্রা

আর্ট প্যালেস থেকে গালাক্টিওনি ব্রীজ পাড়ি দিয়ে শহরের ব্যাস্ত রাস্তা রোজ রেভ্যুলুশন স্কয়ারে জায়ান্ট বাইসাইকেল মনুমেন্ট এর পাশে দাঁড়াই। একটি চাকার ভেতরে হেলান দিয়ে চুপ করে বসে একটি মেয়ে। কিছুটা পেরিয়ে ব্যাস্ত রাস্তায় বেশ কয়েকটি ক্যাফে, বেকারি এবং রেস্ট্যুরেন্ট। লাইনে দাঁড়িয়ে রেডি লাঞ্চের একটা প্যাকেট নিয়ে রাস্তার পাশে বসে পড়ি।

লাঞ্চ শেষে শহরের সর্বোচ্চ স্পট মাটসামিন্দা পাহাড়ের চূড়া যেটিতে যেতে হবে টিবিলিসি ফিউনিকুলারে চড়ে। টিবিলিসি ফিউনিকুলার শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় পরিবহনব্যবস্থা। এটি মূলত একটি পাহাড় বেয়ে ওঠা রেললাইন, যা শহরের কেন্দ্র থেকে সরাসরি মাটসামিন্দা পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে দেয়। প্রথম চালু হয় ১৯০৫ সালে।

ফিউনিকুলারের রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০০ মিটার, আর ঢালু কোণ প্রায় ৩০ ডিগ্রির মতো। দুই দিক থেকে দুইটি ট্রাম সদৃশ গাড়ি একে অপরের বিপরীতে ওঠানামা করে। উপরে উঠতে উঠতে জানালার বাইরে টিবিলিসির মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, নিচে কুরা নদী, পুরোনো শহরের লালচে ছাদ, দূরে সোনালি গম্বুজের সামেবা ক্যাথেড্রাল—সব একসাথে চোখে ধরা দেয়।

চূড়ায় পৌঁছে মাতসামিন্দা পার্ক, যা স্থানীয়দের কাছে বিনোদনের এক প্রিয় স্থান। এখানে আছে রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, পুরোনো ফেরিস হুইল। তবে এটি মূলত পুরো শহর দেখার মনোরম ভিউপয়েন্ট।

ফিউনিকুলার থেকে নেমে হাঁটা পথে এয়ারবিএনবি। পুরোটা শহর বেশ উঁচু নিচু। উঠা নামা করতে করতে বাসায় ফিরে হিশেব করে দেখি প্রায় আঠারো কিলোমিটার মতো পথ হাঁটা হয়েছে। শরীরে ব্যাথা এবং সাথে হালকা জ্বর। প্রথম দিন শেষে অসুস্থ হয়ে পড়লে ট্যুর শেষ। ডেবিটকে কল দিয়ে তাকে নিয়ে বের হয়ে কাছাকাছি ফার্মেসি থেকে প্যানাডল নিলাম। তারপর রাতের ডিনার করে ঘুম।

৩ জুন, ২০১৯: সকালে উঠে চলে যাই ফ্রিডম স্কয়ারের পাশে পুশকিন পার্কে। এখান থেকে গাইডেড ট্যুরে আজকের যাত্রা ডেভিড গারেজি মনাস্টেরি। গত সন্ধ্যায় এ পথে ফেরার পথে গাইডেড ট্যুরের বুকিং কনফরার্ম করে এসেছিলাম। সময়মতো গাড়ি এসে সব যাত্রীকে তুলে নিলো। দূরত্ব প্রায় শ কিলোমিটার। শেষের দিকে অনেকটুকুই অফ রোড।

ডেভিড গারেজি (David Gareji Monastery Complex) জর্জিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে, আজারবাইজান সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত একটি প্রাচীন মঠসমষ্টি। পৌঁছাতে সময় লাগে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা। এই এলাকা জর্জিয়ার অন্যতম ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, যা ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি ভূ-প্রকৃতিগত বৈচিত্র্যের জন্যও বিখ্যাত।

শহর ছাড়িয়ে গাড়ি এগোতে আস্তে আস্তে পাহাড়ি সবুজাভ বাদামি প্রান্তর। পথে হাতের ডানে চোখে পড়ে লবণ হ্রদ কাপাতাদজে। কাপাতাদজে হ্রদের পর রাস্তায় দেখা যায় রেইনবো মাউন্টেন, যা প্রকৃতপক্ষে বর্ণিল খনিজসমৃদ্ধ পাহাড়শ্রেণি। এর মাটি ও শিলার গঠন বহু প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফল। পাহাড়ের স্তরে স্তরে দেখা যায় বিভিন্ন প্রাকৃতিক রঙ — লাল, বাদামি, হলুদ ও সবুজের সংমিশ্রণ। পথে গাড়ির গতিরোধ করে পার হয় অগুনতি ভেড়ার পাল। দূরে পাহাড়ের গায়ে এরা চরে বেড়ায় শস্যদানার খোঁজে। রেইনবো মাউন্টেন পার হওয়ার পর রাস্তা ক্রমশ দুর্গম হয়ে ওঠে। শেষ ১৫–২০ কিলোমিটার মূলত অফ-রোড — পাথুরে ও ধুলোময়।

মঠটি অবস্থিত Gareji semi-desert অঞ্চলে, যা মরুভূমিসদৃশ শুষ্ক প্রান্তর দ্বারা ঘেরা। এটি মূলত পাথরের পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা অসংখ্য গুহা-মঠ, চার্চ, কক্ষ ও প্রার্থনালয়ের সমষ্টি। মঠটি প্রতিষ্ঠিত হয় ৬ষ্ঠ শতকে সিরিয়া থেকে আগত সন্ন্যাসী সেন্ট ডেভিড গারেজেলি কর্তৃক। তিনি জর্জিয়ায় খ্রিস্টধর্ম প্রচারের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। ডেভিড গারেজি আজও জর্জিয়ান অর্থোডক্স চার্চের কাছে এক পবিত্র স্থান। প্রতিবছর অসংখ্য তীর্থযাত্রী এখানে প্রার্থনার জন্য আসেন।

মঠের পেছনের পাহাড়শ্রেণি থেকেই আজারবাইজান সীমান্ত। বেশ কিছুদূর হেঁটে একটি পাহাড়শ্রেণীর উপরে উঠে হাঁটলে একপাশে জর্জিয়া, অন্যপাশে আজারবাইজান। কোনো দৃশ্যমান সীমানা নেই। তবে বন্দুক হাতে অল্প কিছু পাহারাদারকে দেখা যায় এমাথা ওমাথা হেঁটে বেড়াতে এবং ছোট্ট পাহারা কক্ষে অবস্থান করতে।

গারেজি শেষ করে ফেরার পথে নাস্তা বিরতি। সব পর্যটকরা কিছু না কিছু খাবার নিয়ে এদিক সেদিক বসেছে। আমার সামনের খালি টুলে এসে বসলো এক জার্মান তরুণ। নাম জো ড্যানিয়াল। পরিচয় পর্বের পর জানতে চাইল জর্জিয়ায় ট্রিপ প্ল্যান কি, কতো দিন আর কোথায় কোথায় যাবো। অদ্ভুদ্ভাবে আমার প্ল্যান আর ওর প্ল্যান প্রায় আশি শতাংশই মিলে গেল। তখন দু’জনে সিদ্ধান্ত নিলাম একটা গাড়ি ভাড়া করে আমরা এর পরের পাঁচ দিন বিভিন্ন শহর মফস্বল গ্রাম ঘুরে আবার তিবলিসি ফিরে আসবো। সে গাড়ি বুকিং দিয়ে রাখবে। সকালে আমাকে বাক্স প্যাঁটরা সহ তুলে নিবে।

৪-৫ জুন, ২০১৯: সকালে বাক্স প্যাঁটরা গুছিয়ে ফ্রিডম স্কয়ারের পাশে ফুটপাথে অপেক্ষা। জো তুলে নিলো ট্যাক্সিতে যাত্রাপথে। তারপর এয়ারপোর্টে গিয়ে ভাড়া গাড়ি নিয়ে যাত্রা। গন্তব্য ককেশাসের প্রান্তের ছোট্ট শহর মেস্টিয়া। দূরত্ব পৌণে তিনশ কিলোমিটার। কথা ছিল দুজনে ভাগ ভাগ করে গাড়ি চালিয়ে নেব। কিন্ত জো ভাড়া নিয়েছে ম্যনুয়াল গিয়ারের গাড়ি যেটা চালানো ছেড়ে দিয়েছি আট-ন বছর আগে। তাই চেষ্টা করেও সুবিধা করে উঠতে না পেরে স্টিয়ারিং ছেড়ে দিলাম জো কে। ফলে ওকে এ ক’দিন একাই চালাতে হবে। যাত্রা পথে গল্প করতে করতে প্রায় সন্ধ্যায় পৌঁছালাম মেস্টিয়ার হোটেলে।

পরদিন সকালে আমাদের গন্তব্য উশগুলিতে রানী তামারের দুর্গ। দূরত্ব পঞ্চাশ কিলোমিটারের মতো কিন্ত যাত্রাপথ কঠিন। চাই অভিজ্ঞ ড্রাইভার এবং উঁচু গাড়ি। তাই কাছাকাছি স্ট্যান্ড থেকে ভাড়া গাড়িতে করে যাত্রা। জর্জিয়ার উত্তর-পশ্চিমের ককেশাস পর্বতমালা ঘেরা স্ভানেতি অঞ্চলের কেন্দ্র মেস্টিয়া (Mestia)— যার চারপাশে ছড়িয়ে আছে মধ্যযুগীয় স্ভান টাওয়ার, সবুজ উপত্যকা আর তুষারঢাকা চূড়া।

মেস্তিয়া থেকে আরও উঁচুতে বিস্তৃত উশগুলি অঞ্চল (Ushguli area)—যা ইউরোপের অন্যতম উচ্চতম জনবসতিপূর্ণ এলাকা, প্রায় ২,১০০ মিটার উচ্চতায়। এই অঞ্চলে ছোট ছোট স্ভান গ্রাম, প্রাচীন গির্জা ও পাথরের টাওয়ারের সারি।

উশগুলির একটি পাথুরে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছে রানী তামারের দুর্গ (Tamaris Tsikhe)। স্থানীয় বিশ্বাস, ১২শ শতাব্দীর মহান শাসক রানী তামার এখানেই একসময় অবস্থান করেছিলেন বা সামরিক আশ্রয়স্থল হিসেবে দুর্গটি ব্যবহার করতেন। দুর্গ থেকে দেখা যায় চারপাশের অপূর্ব দৃশ্য—উশবা (Ushba) ও টেতনুলদি (Tetnuldi) পর্বতের বরফঢাকা শৃঙ্গ, আর নিচে নীলচে সবুজে মোড়ানো উপত্যকা।

প্রায় পুরোটা দিন দূর্গ, গ্রাম আর প্রকৃতির মাঝে কাটিয়ে বিকেলে রওনা দিয়ে ফিরে আসি মেস্টিয়া। জো প্রস্তাব করে জর্জিয়ান ঐতিহ্যবাহী এবং জনপ্রিয় খাবার খিনকালি (Khinkali) দিয়ে ডিনারের। এটি দেখতে বড় মোমোর মতো, মোটা ময়দার খোলের ভেতরে থাকে রসালো মাংস, পেঁয়াজ ও মসলা। ফুটন্ত পানিতে সিদ্ধ করার পর ভেতরে জমে যায় সুস্বাদু ঝোল। খাওয়ার নিয়ম হল — হাতে ধরে প্রথমে ঝোলটা চুষে নিতে হয়, তারপর বাকি অংশ খাওয়া যায়; নিচের গিঁটটি সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। ডিনার শেষে ক্লান্ত শরীরে হোটেলে ফিরে ঘুম।

৫ম দিন, ৬ জুন, ২০১৯: লাগেজ গুছিয়ে প্ল্যান মতো আমরা মেস্টিয়া শহর ছেড়ে যাচ্ছি। সকালের স্ভানেতির হিমেল হাওয়ায় পাহাড়ের গায়ে সূর্যের তেজ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তুষারঢাকা চূড়াগুলো ক্রিস্টাল আলোয় ঝলমল করছে। আমাদের গাড়ি নামতে থাকে আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তায়, আর পাশে পাশে বয়ে চলে এঙ্গুরি নদী (Enguri River)। হিমবাহ থেকে জন্ম নেওয়া এই নদীর জল যেন কাচের মতো স্বচ্ছ, কখনো নীল, কখনো রুপালি। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে দক্ষিণে নামতেই পৌঁছাই প্রাচীন শহর কুটাইসি (Kutaisi)। এর অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন বাগরাতি ক্যাথেড্রাল, যা ১১শ শতকে রাজা বাগরাত তৃতীয় নির্মাণ করেন। এর স্থাপত্যে রয়েছে জর্জিয়ান মধ্যযুগীয় গির্জা নির্মাণের স্বকীয় শৈলী — উঁচু গম্বুজ, খোদাই করা পাথরের দেয়াল এবং প্রশস্ত খিলান।

শহরের প্রান্তে পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় গেলাটি মঠ (Gelati Monastery)—রাজা ডেভিড দ্য বিল্ডার-এর হাতে নির্মিত, ১২শ শতাব্দীর এক অমর স্থাপত্য। পাথরের দেয়ালে আঁকা রঙিন ফ্রেস্কো, গম্বুজের নিচে নরম আলো, আর চারপাশে নীরবতা। দেয়ালে চিত্রিত আছে খ্রিস্ট, ভার্জিন মেরি, ফেরেশতা, আর রাজা ডেভিডের প্রতিকৃতি। নীল ও সোনালি রঙের সমন্বয়ে তৈরি “The Virgin and child Enthroned” মোজাইকটি সুপরিচিত। প্রতিটি দেয়াল আর গম্বুজে দেখা যায় রঙ ও প্রতীকের সূক্ষ্ম ব্যবহার।

বাগরাতি ক্যাথেড্রাল এবং গেলাটি মনাস্টেরি দুটোকেই নীচের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় ইউনেস্কো ১৯৯৪ সালে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ঘোষণা করে, যদিও পরবর্তীকালে সংস্কারের কারণে দুটোরই মর্যাদা “at risk” হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়।

* জর্জিয়ার স্বর্ণযুগের সাংস্কৃতিক প্রতীক,

* মধ্যযুগীয় বাইজান্টাইন শিল্প ও স্থাপত্যের অনন্য সংমিশ্রণ,

* শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র হিসেবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।

পথ আরও এগোয় দক্ষিণে—সবুজ বন আর পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে বদলে যায় দৃশ্য। বিকেলের আলোয় এসে হাজির হই আমরা বর্জোমি (Borjomi) শহরে। এখানকার গর্ব বর্জোমি মিনারেল স্প্রিংস, যেখান থেকে উৎসারিত হয় প্রাকৃতিক খনিজ জল। পার্কের ভেতর ঝরনার মুখে গিয়ে এক চুমুক খনিজ জলে মুখে যেন প্রকৃতির স্বাদ। বলা হয়, এই জল শতাব্দী ধরে শরীর ও মন দুটোই সতেজ করে।

 

গুগল ম্যাপে খোঁজ করে কাছাকাছি পাই ছোট্ট পারিবারিক রেস্তোরাঁ। এখানে লাঞ্চ করে চলে আসি আমাদের আজকের শেষ গন্তব্য ছোট শহর আখালসিখে (Akhaltsikhe)।

শহরের প্রাণকেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক রাবাতি দুর্গ (Rabati Castle)। এর ইতিহাস শুরু হয় ৯ম শতাব্দীতে, পরবর্তীতে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসনামলে (১৬শ–১৯শ শতাব্দী) দুর্গটি আরও সম্প্রসারিত হয় এবং একটি প্রাচীরবেষ্টিত শহরে পরিণত হয়। প্রবেশদ্বার পেরিয়ে পাথরের সরু রাস্তা ধরে হাঁটলে চোখে পড়ে সোনালী গম্বুজওয়ালা আখমেদিয়া মসজিদ, যার পাশে আছে পুরনো অর্থোডক্স চার্চ। এছাড়াও আছে একটি সিনাগঘ, জাদুঘর, পুরনো রাজপ্রাসাদ, ও একটি দৃষ্টিনন্দন বাগান— যা একে জর্জিয়ার সাংস্কৃতিক বহুত্বের প্রতীক করে তুলেছে।

দুর্গের উপরের দিক থেকে পুরো শহরের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়— বর্তমানে দুর্গটি সুন্দরভাবে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে পুরোনো স্থাপত্যের ছোঁয়া বজায় রেখে পর্যটকদের জন্য আধুনিক সুবিধা যোগ করা হয়েছে। আমরা যখন দূর্গে পৌঁছাই, সূর্য তখন দিগন্তে। আকাশে মেঘ করেছে। গোধূলি-সন্ধ্যার আলোয় রাবাতি ক্যাসেলকে মনে হচ্ছিল রূপকথার কোন কল্পরাজ্য