অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। দেশটিতে স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার হার নেমেছে অনেক। সেই সাথে বেড়েছে প্রত্যাখ্যানের হারও। অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব হোম অ্যাফেয়ার্সের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিদেশ থেকে করা উচ্চশিক্ষার ভিসা আবেদনগুলোর মাত্র ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ অনুমোদন পেয়েছে। গত অন্তত ২১ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম হার।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে যারা আবেদন করেছেন, তাদের ৫১ শতাংশই ভিসা পাননি। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি আবেদনকারী প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। তথ্যটি প্রকাশ করেছে টাইমস হায়ার এডুকেশন।
এতে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশেও ভিসা প্রত্যাখ্যান বেড়েছে। যেমন ভারতে ৪০ শতাংশ, নেপালে ৬৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৩৮ শতাংশ এবং ভুটানে ৩৬ শতাংশ আবেদন বাতিল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন যাচাই-বাছাই আরও কঠোর করেছে। আবেদনকারী সত্যিই পড়াশোনার জন্য যাচ্ছে কি না, সেটি বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ফলে অনেক আবেদন বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আবেদনও বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আবেদন বেড়েছে ৫১ শতাংশ। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ৩৬ শতাংশ আর নেপালে ৯১ শতাংশ। তবে চীন থেকে আবেদন কমেছে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও। ভিসা না পাওয়ার হার বাড়লে কোনো প্রতিষ্ঠানের ‘ঝুঁকি’ বাড়ে। ফলে ভবিষ্যতে সেখানকার আবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হতে পারে।
এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়া। সংগঠনটি বলছে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার যেভাবে বাড়ছে, তা নিয়ে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
সব মিলিয়ে, অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সময়টা সহজ নয়। তাই আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রস্তুতি আরও ভালোভাবে যাচাই করার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
অস্ট্রেলিয়া শিক্ষার্থী ও ভিজিটর ভিসার প্রক্রিয়াকরণ সময় দ্রুততর করেছে, তবে স্থায়ী ভিসার ক্ষেত্রে এখনো দীর্ঘসূত্রতা রয়ে গেছে। ২৩ মার্চ প্রকাশিত দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে এ তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন তথ্যানুযায়ী, শিক্ষার্থী ভিসা গড়ে ৩৩ দিনে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। ভিজিটর ভিসার বেশিরভাগ আবেদন এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হচ্ছে। তবে প্রক্রিয়াকরণের সময় নির্ভর করছে আবেদনপত্রের পূর্ণতা, অতিরিক্ত তথ্যের জবাব দেওয়ার গতি এবং স্বাস্থ্য, চরিত্র ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত যাচাইয়ের ওপর।
এ ছাড়া অস্থায়ী দক্ষ কর্মী ভিসা প্রক্রিয়াকরণে গড়ে ৮৭ দিন সময় লাগছে। অসম্পূর্ণ আবেদন জমা দিলে বিলম্ব হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে জমা দেওয়া শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন বিভিন্ন নীতিমালার আওতায় মূল্যায়ন করা হয়। তাই কোর্স শুরুর অনেক আগে এবং সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র দপ্তর।
অন্যদিকে স্থায়ী ভিসা প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক বেশি সময় লাগছে। দক্ষ কর্মী স্থায়ী ভিসা পেতে গড়ে ৯ মাস এবং পার্টনার ভিসায় প্রায় ১৭ মাস সময় লাগছে। সরকারি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এসব আবেদন প্রক্রিয়া করা হয়। বিশেষ করে আঞ্চলিক এলাকায় নিয়োগদাতার মাধ্যমে আবেদনকারী এবং স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে কর্মরতদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, প্রক্রিয়াকরণের সময় নিয়মিত হালনাগাদ করা হয় এবং ভৌগোলিক অবস্থানসহ বিভিন্ন কারণে তা ভিন্ন হতে পারে। সম্পূর্ণ তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করলে বিলম্ব কমানো সম্ভব বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ভিসার জন্য আবেদন করার সময় ভুয়া
নথি, লাইসেন্সবিহীন এজেন্ট এবং অননুমোদিত অর্থ লেনদেন ব্যবস্থা ব্যবহার না করতে বাংলাদেশি নাগরিকদের সতর্ক করেছে ১৩ পশ্চিমা দেশ। দেশগুলো হলো অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্য।
এই দেশগুলোর বাংলাদেশে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট হাইকমিশন ও দূতাবাসগুলোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে যৌথ এই সতর্ক বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ‘ভিসা, পারমিট বা অন্যান্য কনস্যুলার সেবা নিতে সব আবেদনকারীকে আমরা যৌথভাবে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করার আহ্বান জানাই।’
এতে আবেদনকারীদের ভুয়া নথি, অবিশ্বস্ত বা লাইসেন্সবিহীন এজেন্ট ব্যবহার না করতে এবং অননুমোদিত ব্যক্তি, এজেন্ট বা মিশনের কাছে অর্থ প্রদান না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বার্তায় আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে (ভিসা প্রক্রিয়ায়) বিলম্ব, আর্থিক ক্ষতি, সীমান্তে প্রবেশে বাধা কিংবা গুরুতর আইনি শাস্তির মতো পরিণতি হতে পারে।
মিশনগুলো জানিয়েছে, তারা কোনো এজেন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ভিসা সিদ্ধান্তে বিশেষ প্রভাব বা প্রবেশাধিকার আছে দাবি করা কোনো মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর না করতে আবেদনকারীদের পরামর্শ দিয়েছে তারা।
‘সবসময় যাচাইকৃত তথ্য ও বৈধ কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা সরকারি মাধ্যমের ওপর নির্ভর করুন। সবার জন্য নিরাপদ, ন্যায্য ও স্বচ্ছ আবেদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই আমাদের যৌথ অগ্রাধিকার’, বলা হয়েছে বিবৃতিতে।