নির্বাসনের বৃষ্টি ও শিকড়ের টান

রিজভী শুভ: অ্যাডিলেডের জানলায় এখন বৃষ্টির অবিরাম টোকা পড়ছে। তবে এই বৃষ্টির কোনো ভাষা নেই, অন্তত আমার কাছে নেই। আকাশটা আজ ঠিক যেন অভিমানী কোনো কবির মতো। সকাল থেকেই মেঘে মেঘে ঢেকে আছে মাউন্ট লোফটির চূড়া। মাউন্ট লোফটির মাথা কুয়াশায় ঢাকা—ঠিক যেন এক মুখ গোঁফ রাখা কোনো বয়স্ক লোক গম্ভীর হয়ে বসে আছে, চূড়াটা কুয়াশার চাদরে নিজেকে ঢেকে রেখেছে, যেন পৃথিবীর কোনো এক অমীমাংসিত রহস্য সে লুকিয়ে রাখতে চায়। ধীরলয়ে ঝরতে থাকা বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যখন জানালার কাঁচে এসে পড়ছে, তখন কেন জানি অ্যাডিলেডের এই পরিপাটি শহরটা চোখের সামনে থেকে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। কাঁচের ওপারে গ্লেনেলগের সমুদ্র নয়, বরং আমার মনের আয়নায় ভেসে উঠছে এক চিলতে বাংলাদেশ।

আমরা যারা প্রবাসে থাকি, আমাদের কাছে বৃষ্টি মানে শুধু আবহাওয়া পরিবর্তনের খবর নয়; বৃষ্টি মানে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। আমাদের কাছে বৃষ্টি মানে এক আকাশ মন খারাপ, যার পোশাকি নাম ‘নস্টালজিয়া’। কিন্তু আমার কাছে এটা এক ধরণের অদৃশ্য শৃঙ্খল। এখানে বৃষ্টি মানে একটা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া, আর ওখানে বৃষ্টি ছিল একটা আস্ত জীবনদর্শন। প্রবাসে থাকা আমাদের মতো মানুষদের কাছে বৃষ্টি মানে শুধু এক পশলা জল নয়, এ এক ধরণের দহন। আমরা যখন ভাবি খুব সুখে আছি, ঠিক তখনই এই অকাল বৃষ্টি এসে বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যায়।

অ্যাডিলেড শহরটা খুব নিখুঁত। বৃষ্টি হলে অ্যাডিলেডের ড্রেনেজ সিস্টেমে জল জমে না, রাস্তাগুলো কর্দমাক্ত হয় না।  অথচ এই নিখুঁত জীবনের মাঝে আমি সেই কর্দমাক্ত মেঠো পথটাকে খুঁজছি। তৃষ্ণার্ত মাটির ওপর বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়লে যে তীব্র সোঁদা গন্ধ বের হতো—সেই সুবাস কি পৃথিবীর কোনো দামী সেন্টের শিশিতে পাওয়া সম্ভব? উত্তর হলো—না।

মনে পড়ছে সেই দিনগুলোর কথা, যখন টিনের চালে বৃষ্টি পড়লে মনে হতো কোনো এক অচেনা জাদুকর তার সুরের তরী নামিয়ে এনেছে। সেই অবিরাম ‘টাপুর-টুপুর’ শব্দে কত দুপুর যে জানলার পাশে মাথা রেখে পার করে দিয়েছি, তার কোনো হিসেব নেই। এখানে বৃষ্টির শব্দটা যান্ত্রিক, আর ওখানে বৃষ্টির শব্দটা ছিল একটা হৃদস্পন্দনের মতো।

আজ দুপুরে ক্যাফে থেকে ভেসে আসা কফির কড়া সুবাস কেন জানি ভালো লাগছে না। মনটা ব্যাকুল হয়ে খুঁজছে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সেই ইলিশ মাছ ভাজা আর গরম খিচুড়ির ঘ্রাণ। সেই বৃষ্টির দুপুরের খিচুড়ির স্বাদ কি শুধু চাল-ডাল আর মশলার? মোটেই না। সেই স্বাদটা কি শুধু খাবারের ছিল? না, ওটা ছিল মায়ের হাতের মমতার স্বাদ, পরিবারের সবার সাথে গোল হয়ে বসে বৃষ্টি দেখার এক পশলা সুখ। আজ এই হাজার মাইল দূরে ডাইনিং টেবিলে বসে সেই বৃষ্টির দুপুরগুলোকে বড্ড একা মনে হয়।

মাঝে মাঝে ভাবি, সেই যে আমরা উঠোনের জমে থাকা জলে কাগজের নৌকা ভাসাতাম, সেই নৌকাগুলো গেল কোথায়? আমাদের সেই ছোট ছোট নৌকাগুলো হয়তো বেশিক্ষণ টিকত না, আমাদের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো তো সেই নৌকায় চেপেই রওনা দিয়েছিল। এই বিদেশের প্রশস্ত চকচকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আজ মনে হয়, আমরা কি সেই কাগজের নৌকার সাথে আমাদের শৈশবটাকেও জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছি?

অ্যাডিলেডের এই বৃষ্টিতে ভিজে আজ শরীর ঠান্ডা হলেও, মনের ভেতরটা যেন এক তপ্ত হাহাকারে পুড়ছে। প্রবাস জীবন আমাদের অনেক কিছু দেয়, শুধু কেড়ে নেয় সেই বৃষ্টিতে ভেজা মুহূর্তগুলো। হয়তো আজ রাতেও কোনো এক প্রবাসী বাঙালি জানালার পাশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাববেন— “ইশ! আজ যদি বাংলাদেশে থাকতাম!”

বৃষ্টি আসুক বারবার। শহর বদলালেও আমাদের শিকড়টা তো রয়ে গেছে সেই বৃষ্টির দেশে। মানুষ মরে যায়, কিন্তু মানুষের সেই মাটির গন্ধের টান তো আর মরে না। যেখানেই থাকি না কেন, আমাদের নাড়ির টানটা আজও সেই সোঁদা মাটির দেশেই আটকে আছে। আর এই সত্যটুকু মেনে নেওয়ার নামই বোধহয় জীবন।

Photo credit: মাহবুব সিরাজ তুহিন