তাজ হোসেন: সদ্য মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এক কিশোর, ভর্তি হয় জেলা সদরের একমাত্র সহশিক্ষা’র সরকারি কলেজে। তাঁর চোখে-মুখে অনেক স্বপ্ন থাকলেও, সেগুলি আসলেই অতি মাত্রায় বিমুর্ত, স্পষ্ট কোন অবয়বে বোঝা যায়না। সে বড় হয়ে কি হবে কি করবে তারও দিশা নেই। তবে তাঁকে যে সায়েন্সেই পড়তে হবে, এটাই যখন নিয়তি তখন সে ভর্তিও হয়ে সায়েন্সে বিভাগে। আর সেই সায়েন্স মানে বিশাল সায়েন্স, দুই শত উননব্বই জনের এক বিশাল ছাত্র সমষ্টি, ওহ এর মাঝে অবশ্য মাত্র তিন জনের ছাত্রী সমষ্টিও অন্তর্ভুক্ত।
তো, সেই সায়েন্স গ্রুপের ক্লাশ মানেই বিশাল জনসভা। কলেজের প্রথম দিনে প্রথম ক্লাশ জমে বাংলা বিষয় দিয়ে। বিখ্যাত চিত্র শিল্পীর নামে নাম তাঁর, তখনো অবশ্য সে কিশোর জানতো না এ নামে এক চিত্র শিল্পী আছে, পরে জেনেছে। তাতে কি, স্যার কে ভাল লেগে যায় ঐ নামের বিখ্যাত চিত্র শিল্পী কে না জেনেই। কারণ ছিল, স্যারের কণ্ঠ ছিল মুগ্ধময়, সেই বিশাল ক্লাস রুমের এ মাথা ও মাথা স্যারের কণ্ঠে’র মাধুর্যে মুখর হয়ে থাকতো। স্যার পড়াতে এসে বিষয়ের পাশাপাশি নানা জিনিস ব্যাখ্যা করতেন। এর মধ্যে যেমন থাকতো সিনেমা-ছায়াছবির গল্প কিভাবে উত্থান-পতন হয় তেমনি থাকতো রম্য প্রেমের কবিতা বিশ্লেষণ। এ স্যারের কারণেই বোর্ডের বাংলা পাঠ্য বইয়ের সব গুলো গল্প-কবিতা পাঠ্য বই হিসেবে নয়, মজার উপন্যাস-কবিতা হিসেবে পড়া হয়ে যায়। এবং এতে কিশোর নিজেই অবাক তাঁর নিজের এ পড়া নিয়ে। কারণ তাঁর মত পড়া ফাঁকিবাজের জন্য এটা অবাক করার মতই ঘটনা। একদিন স্যার পড়াতে এসে কথাচ্ছলে এক কবিতা পাঠ করেন, সেই কবিতার একটি লাইন ছিল “হে সুনয়না তোমার হৃদয়ের মিনিবাসে আমার জন্য একটি আসন রাখিও” (এ লাইনটাই মনে আছে শুধু!)।
কিশোর সাইকেল চালিয়ে বাসায় আসার সময় নিজেই বিশ্লেষণে নেমে যায়। এ লাইনের মানে কি! দিন গড়ায় তবে তাঁর মাথায় আসেনা এ “হ্রদয়ের মিনিবাস” এর মানে কি! এ শব্দের সরল মানে দাঁড়ায় বাসের চাইতে ছোট। বড় বাসে ছাপ্পান্ন জনের বসার আসন হলে মিনিবাসে এর অর্ধেক বসার আসন মানে ছাব্বিস হতে ত্রিশজনের বসার ব্যাবস্থা! তবে পড়াশনার চাপে সে ভাবনা বেশীদিন আর থাকেনা।
বড় হতে হতে এক সময় হটাত মাথায় ভর করে সেই হ্রদয়ের মিনিবাস দিয়ে স্যার আসলে কি ব্যাক্ত করেছিলেন তাঁর কবিতায় এবং এর মানেও পেয়ে যায়! এখনকার পোলাপানের অবশ্য কবিতার এ লাইন নিয়ে বিস্ময়ের বা না বোঝার কোন কারণ নেই! প্রায় সকলেই একাধিক হৃদয় আসনের অধিকারী। প্রাণিবিজ্ঞানের বই টই বা কোথায় জেনো পড়েছিলো যে মানুষ বাদে প্রাণিকূলের সব পুরুষ প্রাণীটি সুদর্শন! আবার রীতি অনুযায়ী উভয়েই বা ক্ষেত্র বিশেষে মেয়ে প্রাণিটি বহু হ্রদয়ের অধিকারিণী যেমন মৌমাছি বা পিঁপড়া! মনুষ্যগোষ্ঠী সামাজিক বিধিবিধান বা ধর্মীয় কারণে এক হৃদয়ে বহুজনকে জায়গা দিতে বা প্রেম নিবেদন করতে পারতোনা! এখন সময় বদলে গেছে! হৃদয়ে একাধিক আসন বা জায়গা দিতে না পারাটাই বিস্ময়ের! নানা জনের সাথে নানান ধরনের প্রয়োজনে সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে এমনকি বাংলাদেশের মত রক্ষনশীল সমাজের জনগোষ্ঠীতেও! স্যারের সেই কবিতার লাইন এক অবয়ব পেয়ে যায়! সেই কিশোরের অবশ্য কারো কাছে কোন আসন রাখার আব্দার জানানো হয়নি সে সময়ে, ভয়ে বা শাষনের ভয়ে। সেই কিশোর এখন মধ্যবয়স কাটিয়ে দিয়েছে প্রায়। বহুদিন পরে এসেও তাঁর স্যারের কথাটি প্রায়ই মনে পড়ে যখন সে প্রায়ই দেখে ছোট ছোট দুই দরজার গাড়ী এবং সুনয়নারা একাই গাড়ীতে চলতেছে! এক সার্ভে বলতেছে অষ্ট্রেলিয়ানরা গড়ে তেরো জনের অধিক জনের সাথে সম্পর্কে জড়ায় তাঁদের জীবদ্দশায়! তারপরও এ ছোট ছোট গাড়ী একেবারে কম দেখা যায় না বরং অনেকই দেখা মিলে! ইন্ডিভিজুয়ালিজম বা বাস্তবে আর ভিন্ন অনেক কারণ থাকতে পারে তবু সে ভাবে সুনয়নাদের আসন বয়সের সাথে সাথে এমনই কমে গেছে যে তাদের গাড়িতে একমাত্র চালকের মানে নিজের আসন ছাড়া গাড়িতে আর কোন আসনই নেই বা বসার জায়গাই নেই!!!