অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের হ্যালডন স্ট্রিট এখন যেন এক উৎসবের নগরী। পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও বসেছে সিডনির সবচেয়ে জনপ্রিয় আয়োজন ‘লাকেম্বা নাইটস’ (Ramadan Nights Lakemba)। সূর্যাস্তের পর ইফতার শেষ হতেই হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠছে এই এলাকা, যা চলছে গভীর রাত পর্যন্ত।
বিশ্বজয়ী খাবারের সমারোহ
লাকেম্বা নাইটস মানেই জিভে জল আনা হরেক রকমের খাবারের মেলা। সিডনির এই এলাকাটি এখন যেন আরব, এশিয়া আর আফ্রিকার সেতুবন্ধন। ভোজনরসিকদের জন্য এখানে রয়েছে দেশ-বিদেশের বৈচিত্র্যময় সব আয়োজন।
এবারের উৎসবের মূল আকর্ষণ:
- বিখ্যাত ক্যামেল বার্গার: লাকেম্বার সিগনেচার ডিশ হিসেবে পরিচিত উটের মাংসের বার্গার খেতে স্টলগুলোতে দেখা গেছে ভোজনরসিকদের দীর্ঘ সারি।
- মিষ্টির আমেজ: লেবানিজ ‘কুনাফা’ (Knafeh), বাকলাভা এবং গরম গরম জিলাপির সুবাস চারদিকে মৌ মৌ করছে। বিশেষ করে এবার তুর্কি কফির সাথে কুনাফার জুড়ি মেলা ভার।
- দেশি স্বাদ: পিছিয়ে নেই বাঙালিরাও। চটপটি, ফুচকা, তেহারি আর ঝালমুড়ির স্টলগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
- অন্যান্য স্বাদ: ইন্দোনেশীয় সাতায় (Skewers), তুর্কি গোজলেম এবং রিফ্রেশিং আখের রসও দর্শনার্থীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে।
সম্প্রীতির এক অনন্য চিত্র
কেবল মুসলিম ধর্মাবলম্বীরাই নন, অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষ এই উৎসবে সামিল হচ্ছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, লাকেম্বা নাইটস এখন কেবল একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ নয়, বরং এটি সিডনির বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
পরিবার নিয়ে আসা এক প্রবাসী বলেন, “এখানে আসলে মনে হয় না যে আমরা দেশের বাইরে আছি। মানুষের কোলাহল আর খাবারের এই আমেজ আমাদের ঢাকার বেইলি রোড বা চকবাজারের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।”
দর্শনার্থীদের জন্য পরামর্শ
আয়োজক প্রতিষ্ঠান ক্যান্টারবারি-ব্যাংকসটাউন কাউন্সিলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রমজান মাসজুড়ে প্রতি বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার এই মেলা বসবে। অতিরিক্ত ভিড় ও পার্কিং সমস্যা এড়াতে দর্শনার্থীদের ট্রেন বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করার বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সিডনির এই ‘ফুড কার্নিভাল’ এখন বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের কাছেও অন্যতম আকর্ষণ। রমজানের এই রাতগুলো সিডনিকে দিচ্ছে এক ভিন্ন পরিচয়, যেখানে খাবারের স্বাদে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে সংস্কৃতি ও সম্প্রীতি।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বাস করেন লাকেম্বা ও ওয়ালী পার্ক এলাকায়। লাকেম্বার রেলওয়ে প্যারেডে বাংলাদেশী খাদ্যপণ্যের বিপণী ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে বেশ কয়েকটি। পুরো বছর জুড়ে সেখানে বাঙালিদের আনাগোনা চলে। চটপটি, ফুচকা, সিঙাড়া, পিঁয়াজুর পাশাপাশি দেশী হাতের রান্নার আকর্ষণে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে প্রবাসী বাংলাদেশীরা।
বছর ঘুরে রমজান মাস এলে লাকেম্বাও গম গম করে বাঙালিদের পদভারে। গত দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে লাকেম্বায় বসছে ইফতার বাজার। বিকাল থেকে শুরু হয়ে প্রায় ভোর রাত পর্যন্ত খোলা থাকে এখানকার রেস্টুরেন্টগুলো। বিশেষত, শনি-রবিবার উইকএন্ডে পা রাখার জায়গা পাওয়া যায় না এখানে।