প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনে ‘চাঁদ রাত’ কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি যেন হারিয়ে যাওয়া শৈশব আর শেকড়ের টানকে ফিরে পাওয়ার একটি মুহূর্ত। দেশে থাকতে আমরা যে আনন্দটা পাড়ার অলিতে-গলিতে পেতাম, প্রবাসে সেই একই আবেগ ফুটে ওঠে বিভিন্ন কমিউনিটি ইভেন্ট বা ঘরোয়া আয়োজনে।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাঙালিদের কাছে ‘চাঁদ রাত’ উৎসব কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, এটি যেন সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে এক টুকরো বাংলাদেশ। সিডনি, মেলবোর্ন, পার্থ কিংবা এ্যাডিলেড—শহর যাই হোক না কেন, রমজানের শেষে শাওয়ালের চাঁদ দেখা দেওয়ার আনন্দ প্রবাসীদের এক সুতোয় গেঁথে ফেলে।
প্রবাসে যখন শয়ে শয়ে বাঙালি একসাথে সমবেত হয়, তখন মনেই হয় না যে আমরা দেশের বাইরে আছি। চারদিকে বাংলা কথা, চটপটির সুবাস আর রঙিন পাঞ্জাবি-শাড়ির সমারোহ মুহূর্তেই পরিবেশটাকে বদলে দেয়। বিদেশে বড় হওয়া শিশুদের কাছে ঈদ বা চাঁদ রাত মানেই এই উৎসবগুলো। মেহেদী লাগানো, রঙিন জামা পরা আর বড়দের সাথে মেলায় যাওয়ার মাধ্যমে তারা আমাদের সংস্কৃতিকে চিনতে শেখে।
দেশের মতো এখানে রাত জেগে শপিং করার সুযোগ কম থাকলেও, চাঁদ রাতের স্টলগুলো সেই অভাব পূরণ করে। স্টলে স্টলে ঘুরে গয়না দেখা বা দেশি ঘরানার কারুকাজ করা পোশাক কেনা প্রবাসীদের জন্য এক পরম পাওয়া। বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতদের সাথে আড্ডায় প্রবাসীরা বারবার ফিরে যান দেশে কাটানো সেই পুরনো চাঁদ রাতগুলোতে। এই আড্ডাগুলোই প্রবাসের নিঃসঙ্গতাকে ভুলিয়ে দেয়।

অস্ট্রেলিয়ার সাউথ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী এ্যাডিলেডে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন বাংলাদেশ ক্লাব অস্ট্রেলিয়া ইনক (BCA)-এর উদ্যোগে আয়োজিত হতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘চাঁদ রাত’ উৎসব। ২০১৭ সালে প্রথম পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ক্লাব অস্ট্রেলিয়া ইনক (BCA)-এর উদ্যোগে আয়োজিত হয় চাঁদ রাত। বরাবরের মতো এবারও প্রবাসীদের প্রাণের মেলবন্ধনে মুখরিত হবে এ্যাডিলেড। এ্যাডিলেডের প্রবাসী সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে এখনকার চাঁদ রাত উৎসবগুলো সিডনি বা মেলবোর্নের মতোই জমকালো হয়ে উঠেছে।
প্রতিবছরই ঈদের আগের রাতে এ্যাডিলেডের কোনো বড় কমিউনিটি সেন্টারে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের উৎসবেও থাকছে দেশীয় সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ।
উৎসবের মূল আকর্ষণ হিসেবে থাকছে: মেহেদী উৎসব: ছোট-বড় সবার জন্য থাকছে দক্ষ মেহেদী শিল্পীদের স্টল। দেশি খাবারের সমারোহ: চটপটি, ফুচকা, বিরিয়ানি থেকে শুরু করে ঘরে তৈরি পিঠা-পুলির স্টলে রসনা তৃপ্তির সুযোগ। কেনাকাটার ধুম: শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং দেশীয় গয়নার স্টলগুলোতে শেষ মুহূর্তের ঈদ শপিংয়ের আমেজ।
মিলনমেলায় রূপ নেবে প্রবাস জীবন: বিসিএ-র একজন নির্বাহী সদস্য জানান, “বিদেশের ব্যস্ত জীবনে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং ঈদের আনন্দ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। এটি কেবল একটি মেলা নয়, বরং এটি এ্যাডিলেডে বসবাসরত বাংলাদেশিদের একটি মিলনমেলা।”
ঈদের আগের দিন বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলবে এই বর্ণাঢ্য আয়োজন। স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন এই দিনটির জন্য, যেখানে প্রবাসের যান্ত্রিকতা ভুলে সবাই মেতে উঠবেন ঈদের আনন্দে। এই অনুষ্টানটি ম্যাশন লেকের ডেনিসন সেন্টারে ১৯ মার্চ ২০২৬ এ অনুষ্ঠিত হবে।